সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নগর অব্যবস্থাপনার নির্মম বলি: ম্যানহোল থেকে ২ কিলোমিটার দূরে মিলল চাকরিজীবী নারীর নিথর দেহ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:২৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
  • / ১৫৩ Time View

image 2 2507291357

image 2 2507291357

গাজীপুরের টঙ্গিতে খোলা ম্যানহোলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া ফারিয়া তাসনিম জ্যোতির মর্মান্তিক মৃত্যু কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকাবাসীকে। ঘটনার ৩৭ ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ পাওয়া যায় ম্যানহোল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরের একটি বিলে—যা নগর ব্যবস্থাপনার গাফিলতি ও নাগরিক নিরাপত্তার চরম সংকটকে ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

রোববার রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের হোসেন মার্কেট এলাকার ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎই রাস্তার মধ্যে খোলা থাকা ম্যানহোলে পড়ে যান জ্যোতি। স্থানীয়রা তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। এরপর দীর্ঘ ৩৭ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টায়, অবশেষে মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় টেকবাড়ি বিল এলাকা থেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জ্যোতির পরনের পোশাক, হাতের ঘড়ি, গলার চেইন ও চুড়িগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ছিল—যা এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবেই প্রতীয়মান করে। কিন্তু এই ‘দুর্ঘটনা’ আদৌ কেবল দুর্ঘটনা, না কি নগর অব্যবস্থাপনার ফাঁদে নিঃশব্দ মৃত্যু—এই প্রশ্নই এখন সামনে উঠে আসছে।

জ্যোতির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এক প্রতিবাদী কণ্ঠে স্থানীয় এক নারী বলেন, “আজ আমার বোন মরেছে, কাল হয়তো আপনারও পরিবার হারাবে প্রিয়জনকে। খোলা ড্রেন, খোলা ম্যানহোল, কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই।” তিনি আরও বলেন, “এখানে মানুষের জীবনের চেয়ে উন্নয়নের পোস্টার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

এ ঘটনার পরপরই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যেখানে ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগকে এই ঘটনার গাফিলতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

নিহত ফারিয়া তাসনিম জ্যোতি একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। দুই সন্তানের মা এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত ছিলেন তিনি। তাঁর এই অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। এই মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় কতটা অসচেতনতা, উদাসীনতা এবং জবাবদিহির অভাব বিদ্যমান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খোলা ম্যানহোল, ড্রেন, অপরিকল্পিত রাস্তা এবং নিরাপত্তাহীন নগর অবকাঠামো বাংলাদেশের বহু শহরের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু প্রশাসনের চোখে তা যেন স্বাভাবিক চিত্র। যতক্ষণ না প্রাণ যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেই।

জ্যোতির মৃত্যু যেন আরেকটি সংখ্যা না হয়ে যায়, সেই প্রত্যাশা সকলের। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু এড়াতে একটি পরিকল্পিত ও মানবিক নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবিতে এখন সোচ্চার সাধারণ মানুষ। কারণ, এই মৃত্যু শুধু জ্যোতির নয়—এটি প্রতিটি পথচারী, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নগর অব্যবস্থাপনার নির্মম বলি: ম্যানহোল থেকে ২ কিলোমিটার দূরে মিলল চাকরিজীবী নারীর নিথর দেহ

Update Time : ১০:২৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫

image 2 2507291357

গাজীপুরের টঙ্গিতে খোলা ম্যানহোলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া ফারিয়া তাসনিম জ্যোতির মর্মান্তিক মৃত্যু কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকাবাসীকে। ঘটনার ৩৭ ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ পাওয়া যায় ম্যানহোল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরের একটি বিলে—যা নগর ব্যবস্থাপনার গাফিলতি ও নাগরিক নিরাপত্তার চরম সংকটকে ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

রোববার রাতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের হোসেন মার্কেট এলাকার ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎই রাস্তার মধ্যে খোলা থাকা ম্যানহোলে পড়ে যান জ্যোতি। স্থানীয়রা তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। এরপর দীর্ঘ ৩৭ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টায়, অবশেষে মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় টেকবাড়ি বিল এলাকা থেকে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জ্যোতির পরনের পোশাক, হাতের ঘড়ি, গলার চেইন ও চুড়িগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় ছিল—যা এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবেই প্রতীয়মান করে। কিন্তু এই ‘দুর্ঘটনা’ আদৌ কেবল দুর্ঘটনা, না কি নগর অব্যবস্থাপনার ফাঁদে নিঃশব্দ মৃত্যু—এই প্রশ্নই এখন সামনে উঠে আসছে।

জ্যোতির মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এক প্রতিবাদী কণ্ঠে স্থানীয় এক নারী বলেন, “আজ আমার বোন মরেছে, কাল হয়তো আপনারও পরিবার হারাবে প্রিয়জনকে। খোলা ড্রেন, খোলা ম্যানহোল, কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই।” তিনি আরও বলেন, “এখানে মানুষের জীবনের চেয়ে উন্নয়নের পোস্টার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

এ ঘটনার পরপরই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যেখানে ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগকে এই ঘটনার গাফিলতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

নিহত ফারিয়া তাসনিম জ্যোতি একজন কর্মজীবী নারী ছিলেন। দুই সন্তানের মা এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে কর্মরত ছিলেন তিনি। তাঁর এই অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। এই মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় কতটা অসচেতনতা, উদাসীনতা এবং জবাবদিহির অভাব বিদ্যমান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। খোলা ম্যানহোল, ড্রেন, অপরিকল্পিত রাস্তা এবং নিরাপত্তাহীন নগর অবকাঠামো বাংলাদেশের বহু শহরের সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু প্রশাসনের চোখে তা যেন স্বাভাবিক চিত্র। যতক্ষণ না প্রাণ যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেই।

জ্যোতির মৃত্যু যেন আরেকটি সংখ্যা না হয়ে যায়, সেই প্রত্যাশা সকলের। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু এড়াতে একটি পরিকল্পিত ও মানবিক নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবিতে এখন সোচ্চার সাধারণ মানুষ। কারণ, এই মৃত্যু শুধু জ্যোতির নয়—এটি প্রতিটি পথচারী, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন।