সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উগান্ডায় মামদানির রাজকীয় বিয়ে: বুজিগা হিলে জমকালো আয়োজন, মুখোশধারী নিরাপত্তা, তিনদিনব্যাপী উৎসব

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫০:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫
  • / ১৯৫ Time View

prothomalo bangla 2025 07 28 fvf8ib81 mamdani

prothomalo bangla 2025 07 28 fvf8ib81 mamdani

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার অভিজাত এলাকা বুজিগা হিলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে এক চোখধাঁধানো রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান। আয়োজনটি ঘিরে পুরো এলাকাজুড়ে ছিল চমকপ্রদ সাজসজ্জা, নিরাপত্তার কঠোর বলয় এবং অভিজাত অতিথিদের উপস্থিতি। বিয়েটি কার? সেই ব্যক্তি আর কেউ নন—জোহরান মামদানি, যিনি বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরের ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মেয়র পদপ্রার্থী। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে পুরো বুজিগা হিল যেন রূপ নিয়েছিল এক স্বপ্নপুরীতে।

৩৩ বছর বয়সী মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের উদীয়মান এক রাজনীতিক। ২৭ বছর বয়সী রামা দুয়াজির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় একটি ডেটিং অ্যাপে। সেখান থেকেই সম্পর্কের শুরু। তাদের প্রেম কাহিনির গতি পায় গত বছর ডিসেম্বরে দুবাইয়ে বাগদান এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে ছোট পরিসরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে পারিবারিক শেকড়ের টানে মামদানি এবার উগান্ডায় আয়োজন করেন এক বিশাল পরিসরের বিবাহোৎসব। তিনি নিজেই জন্মেছিলেন এই আফ্রিকান দেশটিতে, যদিও মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন।

বিয়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় মামদানিদের পারিবারিক বাড়িতে, যা কাম্পালার অন্যতম অভিজাত এলাকা বুজিগা হিলে অবস্থিত। এই বাড়িটির মালিক মামদানির বাবা, খ্যাতিমান অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি (৭৮)। তাঁর মা মীরা নায়ার (৬৭) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা। বুজিগা হিল এমনিতেই উচ্চবিত্তদের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত, তবে এই বিয়ের আয়োজনে বাড়িটি যেন এক রাজপ্রাসাদে রূপ নেয়। বাগানে ঝুলছিল রঙিন বাতি, ভেসে আসছিল মনমুগ্ধকর সংগীত, আর অতিথিদের বহনে আসছিল মার্সিডিজ, রেঞ্জ রোভারসহ নামীদামী ব্র্যান্ডের গাড়ি।

বিয়েতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল নজিরবিহীন। এলাকায় সাধারণত এত কড়া নিরাপত্তা দেখা যায় না। কিন্তু মামদানির বিয়ের দিন বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন ২০ জনের বেশি বিশেষ নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য, যাদের অনেকে মুখোশ পরে ছিলেন। এমনকি মোবাইল ফোনের জ্যামার পর্যন্ত বসানো হয়, যাতে অনুষ্ঠানস্থলের কোনো তথ্য বাইরে না যায়। বাড়ির একটি প্রধান ফটকে কেবল নয়জন নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্বে ছিলেন, যা পুরো আয়োজনের গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা বোঝায়।

বিয়ের দ্বিতীয় দিন ও বিশেষ করে বৃহস্পতিবারের আয়োজন ছিল আরও জমকালো। ভারতীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে সাজানো এই আয়োজনে পরিবেশিত হয় ফলের জুস, চলতে থাকে প্রাণবন্ত নাচ-গান। মামদানি নিজেও মাইক্রোফোনে অতিথিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিন দিন ধরে চলা এই রাজকীয় আয়োজনে রাত গভীর হলেও উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। শুক্রবার সকালে আয়োজনের তাঁবুগুলো গুটিয়ে ফেলা হয় এবং অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ফুলগুলো স্তূপ করে রাখা হয় বাড়ির ফটকের বাইরে।

তবে এই আনন্দঘন আয়োজনের বিপরীতে উঠে এসেছে কিছু সমালোচনাও। বিয়ের আসর বসার সময়ই মামদানির বাড়ির পাশেই শোকাবহ পরিবেশে ছিল আরেকটি পরিবার। ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন উগান্ডার সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত বিচারপতি জর্জ কানইয়েইহামবা। তাঁর বাসভবন মামদানির বাড়ির একদম পাশেই। পরিবারের একজন সদস্য অভিযোগ করেন, “তিনি এখনো সমাহিতও হননি। স্বজনেরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন। অথচ ঠিক এই সময়ে মামদানির পরিবার তিন দিন ধরে সাড়ম্বরে বিয়ে উদ্‌যাপন করছে।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানতেনই না ভিতরে কী হচ্ছে। এক বাসিন্দা বিস্মিত হয়ে বলেন, “আমরা শুনেছি মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র হতে যাচ্ছেন। তাহলে কি আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসা পাওয়া সহজ হবে?” তার এই প্রশ্ন শুধু কৌতূহলের নয়, বরং মামদানির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনারই প্রতিফলন।

অভিজাত বিয়ের আড়ালে এই আয়োজন যেমন ছিল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা, তেমনি ছিল সামাজিক বিতর্ক ও প্রশ্নের খোরাক। মামদানি যেভাবে তাঁর শেকড়ের টানে নিজ দেশে ফিরে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করেছেন, তা যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সময় ও প্রেক্ষাপট ঘিরে। উগান্ডার ইতিহাসে এই বিয়ে নিঃসন্দেহে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

উগান্ডায় মামদানির রাজকীয় বিয়ে: বুজিগা হিলে জমকালো আয়োজন, মুখোশধারী নিরাপত্তা, তিনদিনব্যাপী উৎসব

Update Time : ১০:৫০:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই ২০২৫

prothomalo bangla 2025 07 28 fvf8ib81 mamdani

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার অভিজাত এলাকা বুজিগা হিলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে এক চোখধাঁধানো রাজকীয় বিয়ের অনুষ্ঠান। আয়োজনটি ঘিরে পুরো এলাকাজুড়ে ছিল চমকপ্রদ সাজসজ্জা, নিরাপত্তার কঠোর বলয় এবং অভিজাত অতিথিদের উপস্থিতি। বিয়েটি কার? সেই ব্যক্তি আর কেউ নন—জোহরান মামদানি, যিনি বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরের ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে মেয়র পদপ্রার্থী। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে পুরো বুজিগা হিল যেন রূপ নিয়েছিল এক স্বপ্নপুরীতে।

৩৩ বছর বয়সী মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের উদীয়মান এক রাজনীতিক। ২৭ বছর বয়সী রামা দুয়াজির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় একটি ডেটিং অ্যাপে। সেখান থেকেই সম্পর্কের শুরু। তাদের প্রেম কাহিনির গতি পায় গত বছর ডিসেম্বরে দুবাইয়ে বাগদান এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে ছোট পরিসরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে পারিবারিক শেকড়ের টানে মামদানি এবার উগান্ডায় আয়োজন করেন এক বিশাল পরিসরের বিবাহোৎসব। তিনি নিজেই জন্মেছিলেন এই আফ্রিকান দেশটিতে, যদিও মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন।

বিয়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় মামদানিদের পারিবারিক বাড়িতে, যা কাম্পালার অন্যতম অভিজাত এলাকা বুজিগা হিলে অবস্থিত। এই বাড়িটির মালিক মামদানির বাবা, খ্যাতিমান অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি (৭৮)। তাঁর মা মীরা নায়ার (৬৭) আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা। বুজিগা হিল এমনিতেই উচ্চবিত্তদের বাসস্থান হিসেবে পরিচিত, তবে এই বিয়ের আয়োজনে বাড়িটি যেন এক রাজপ্রাসাদে রূপ নেয়। বাগানে ঝুলছিল রঙিন বাতি, ভেসে আসছিল মনমুগ্ধকর সংগীত, আর অতিথিদের বহনে আসছিল মার্সিডিজ, রেঞ্জ রোভারসহ নামীদামী ব্র্যান্ডের গাড়ি।

বিয়েতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল নজিরবিহীন। এলাকায় সাধারণত এত কড়া নিরাপত্তা দেখা যায় না। কিন্তু মামদানির বিয়ের দিন বাড়ির বাইরে অবস্থান করছিলেন ২০ জনের বেশি বিশেষ নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্য, যাদের অনেকে মুখোশ পরে ছিলেন। এমনকি মোবাইল ফোনের জ্যামার পর্যন্ত বসানো হয়, যাতে অনুষ্ঠানস্থলের কোনো তথ্য বাইরে না যায়। বাড়ির একটি প্রধান ফটকে কেবল নয়জন নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্বে ছিলেন, যা পুরো আয়োজনের গুরুত্ব ও স্পর্শকাতরতা বোঝায়।

বিয়ের দ্বিতীয় দিন ও বিশেষ করে বৃহস্পতিবারের আয়োজন ছিল আরও জমকালো। ভারতীয় ঐতিহ্যের অনুকরণে সাজানো এই আয়োজনে পরিবেশিত হয় ফলের জুস, চলতে থাকে প্রাণবন্ত নাচ-গান। মামদানি নিজেও মাইক্রোফোনে অতিথিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিন দিন ধরে চলা এই রাজকীয় আয়োজনে রাত গভীর হলেও উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। শুক্রবার সকালে আয়োজনের তাঁবুগুলো গুটিয়ে ফেলা হয় এবং অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ফুলগুলো স্তূপ করে রাখা হয় বাড়ির ফটকের বাইরে।

তবে এই আনন্দঘন আয়োজনের বিপরীতে উঠে এসেছে কিছু সমালোচনাও। বিয়ের আসর বসার সময়ই মামদানির বাড়ির পাশেই শোকাবহ পরিবেশে ছিল আরেকটি পরিবার। ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন উগান্ডার সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত বিচারপতি জর্জ কানইয়েইহামবা। তাঁর বাসভবন মামদানির বাড়ির একদম পাশেই। পরিবারের একজন সদস্য অভিযোগ করেন, “তিনি এখনো সমাহিতও হননি। স্বজনেরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসছেন। অথচ ঠিক এই সময়ে মামদানির পরিবার তিন দিন ধরে সাড়ম্বরে বিয়ে উদ্‌যাপন করছে।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানতেনই না ভিতরে কী হচ্ছে। এক বাসিন্দা বিস্মিত হয়ে বলেন, “আমরা শুনেছি মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র হতে যাচ্ছেন। তাহলে কি আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসা পাওয়া সহজ হবে?” তার এই প্রশ্ন শুধু কৌতূহলের নয়, বরং মামদানির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনারই প্রতিফলন।

অভিজাত বিয়ের আড়ালে এই আয়োজন যেমন ছিল সাংস্কৃতিক মিলনমেলা, তেমনি ছিল সামাজিক বিতর্ক ও প্রশ্নের খোরাক। মামদানি যেভাবে তাঁর শেকড়ের টানে নিজ দেশে ফিরে রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করেছেন, তা যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সময় ও প্রেক্ষাপট ঘিরে। উগান্ডার ইতিহাসে এই বিয়ে নিঃসন্দেহে স্মরণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।