সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দানের টাকায় পড়া রিয়াদের পাকা বাড়ি ও বিলাসী জীবন: ছাত্রলীগ থেকে সমন্বয়ক হয়ে চাঁদাবাজিতে উত্থান

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৪০:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫
  • / ৩৩৫ Time View

4df006228432b1cd797236fbbac2e242 6887182c6012b

4df006228432b1cd797236fbbac2e242 6887182c6012b

দারিদ্র্যের অতল গহ্বর থেকে উঠে এসে রাজধানীর রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ। একসময় তিনি ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক। কিন্তু তার এই উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রে—না গুণে, বরং চাঁদাবাজির অভিযোগে। গত শনিবার রাজধানীর গুলশান এলাকায় চার সহযোগীসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছেন তিনি। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সংগঠন থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

রিয়াদের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার নিজ জেলা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, রিয়াদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। দাদা ও বাবা উভয়েই ছিলেন রিকশাচালক। পরবর্তীতে তার বাবা দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। মা নাজমুন নাহার অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এমন একটি পরিবার থেকে উঠে এসে পাকা বাড়ি, দামি গাড়ি আর প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ছবি—সবই আজ রহস্যে মোড়া।

ছাত্ররাজনীতির শুরু আর আকস্মিক উত্থান
রিয়াদ নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন এবং পরে ভর্তি হন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সরকারি মুজিব কলেজে। সেখানে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বাহিনীতে যুক্ত হন ফুল দিয়ে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে। সেখান থেকে ঢাকায় এসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, আর তখনই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

প্রথমে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হন, পরে পরিচিতি পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে। কিন্তু আওয়ামী দুঃশাসনের পতনের পর ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে জড়িয়ে পড়েন ভয়ংকর চাঁদাবাজিতে। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রামে ফিরলে দেখা মেলে পরিবর্তনের চিত্র
নবীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রিয়াদের পরিবারে আগের অভাব-অনটনের কোনো চিহ্ন নেই। ভাঙাচোরা কাঁচা ঘরের জায়গায় ছাদ ঢালাই করা পাকা দোতলা বাড়ি উঠছে। গ্রামবাসীরা বলছেন, যাদের এক সময় দুই বেলা খেতে কষ্ট হতো, আজ তারা পাকা বাড়ির মালিক—এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

রিয়াদের মা নাজমুন নাহার চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “আমরা না খেয়ে ওরে শহরে পাঠাইছিলাম। দান-খয়রাতে, মসজিদের মানুষের সাহায্যে ও পড়াশোনা করছে। টিভিতে দেখি পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। বলে চাঁদাবাজি করছে। আমার বিশ্বাস হয় না। ওরে কেউ ফাঁসাইছে।”

প্রভাবশালী রাজনৈতিক যোগাযোগ সামাজিক মিডিয়া
রিয়াদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত নিজের প্রভাবশালী যোগাযোগ তুলে ধরতেন। তার ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ছবি, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এমন বিলাসী জীবন ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়।

প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন জনমত
রিয়াদের গ্রামের প্রতিবেশীরা বলছেন, “এমন একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে, যে দানের টাকায় লেখাপড়া করেছে, সে কিভাবে রাজধানীতে বিলাসী জীবনযাপন করে তা খতিয়ে দেখা দরকার।” কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, রিয়াদের মতো আরও অনেক সমন্বয়ক-ছদ্মবেশী তরুণ সমাজে লুকিয়ে আছে যারা রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে সম্পদ গড়ছে।

নবীপুর হাই স্কুলের সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, “ওকে আমরা বই-খাতা কিনে দিতাম, স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিরা ওর জন্য সাহায্য করতেন। সে আজ ভয়ংকর অপরাধী! এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রশাসনের উচিত এমন মানুষদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।”

দারিদ্র্য থেকে রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসা অনেক তরুণের গল্প প্রেরণার হলেও, রিয়াদের কাহিনী এখন সতর্কতা হিসেবে উঠে আসছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ চর্চার সুযোগ পেলে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, তার এক বাস্তব উদাহরণ রিয়াদ। প্রশাসন, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের একযোগে কাজ করতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো রিয়াদ জন্ম না নেয়—যে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে সমাজকে শোষণ করে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

দানের টাকায় পড়া রিয়াদের পাকা বাড়ি ও বিলাসী জীবন: ছাত্রলীগ থেকে সমন্বয়ক হয়ে চাঁদাবাজিতে উত্থান

Update Time : ০২:৪০:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫

4df006228432b1cd797236fbbac2e242 6887182c6012b

দারিদ্র্যের অতল গহ্বর থেকে উঠে এসে রাজধানীর রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ। একসময় তিনি ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক। কিন্তু তার এই উত্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রে—না গুণে, বরং চাঁদাবাজির অভিযোগে। গত শনিবার রাজধানীর গুলশান এলাকায় চার সহযোগীসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছেন তিনি। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সংগঠন থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।

রিয়াদের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার নিজ জেলা নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, রিয়াদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। দাদা ও বাবা উভয়েই ছিলেন রিকশাচালক। পরবর্তীতে তার বাবা দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। মা নাজমুন নাহার অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এমন একটি পরিবার থেকে উঠে এসে পাকা বাড়ি, দামি গাড়ি আর প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ছবি—সবই আজ রহস্যে মোড়া।

ছাত্ররাজনীতির শুরু আর আকস্মিক উত্থান
রিয়াদ নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন এবং পরে ভর্তি হন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সরকারি মুজিব কলেজে। সেখানে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার বাহিনীতে যুক্ত হন ফুল দিয়ে ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে। সেখান থেকে ঢাকায় এসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, আর তখনই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

প্রথমে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হন, পরে পরিচিতি পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে। কিন্তু আওয়ামী দুঃশাসনের পতনের পর ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে জড়িয়ে পড়েন ভয়ংকর চাঁদাবাজিতে। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্রামে ফিরলে দেখা মেলে পরিবর্তনের চিত্র
নবীপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রিয়াদের পরিবারে আগের অভাব-অনটনের কোনো চিহ্ন নেই। ভাঙাচোরা কাঁচা ঘরের জায়গায় ছাদ ঢালাই করা পাকা দোতলা বাড়ি উঠছে। গ্রামবাসীরা বলছেন, যাদের এক সময় দুই বেলা খেতে কষ্ট হতো, আজ তারা পাকা বাড়ির মালিক—এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

রিয়াদের মা নাজমুন নাহার চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “আমরা না খেয়ে ওরে শহরে পাঠাইছিলাম। দান-খয়রাতে, মসজিদের মানুষের সাহায্যে ও পড়াশোনা করছে। টিভিতে দেখি পুলিশ আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে। বলে চাঁদাবাজি করছে। আমার বিশ্বাস হয় না। ওরে কেউ ফাঁসাইছে।”

প্রভাবশালী রাজনৈতিক যোগাযোগ সামাজিক মিডিয়া
রিয়াদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত নিজের প্রভাবশালী যোগাযোগ তুলে ধরতেন। তার ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে ছবি, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেকেই বলছেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এমন বিলাসী জীবন ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়।

প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন জনমত
রিয়াদের গ্রামের প্রতিবেশীরা বলছেন, “এমন একজন দরিদ্র পরিবারের ছেলে, যে দানের টাকায় লেখাপড়া করেছে, সে কিভাবে রাজধানীতে বিলাসী জীবনযাপন করে তা খতিয়ে দেখা দরকার।” কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, রিয়াদের মতো আরও অনেক সমন্বয়ক-ছদ্মবেশী তরুণ সমাজে লুকিয়ে আছে যারা রাজনীতির নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে সম্পদ গড়ছে।

নবীপুর হাই স্কুলের সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, “ওকে আমরা বই-খাতা কিনে দিতাম, স্থানীয় মসজিদের মুসল্লিরা ওর জন্য সাহায্য করতেন। সে আজ ভয়ংকর অপরাধী! এটা আমাদের জন্য লজ্জার। প্রশাসনের উচিত এমন মানুষদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।”

দারিদ্র্য থেকে রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসা অনেক তরুণের গল্প প্রেরণার হলেও, রিয়াদের কাহিনী এখন সতর্কতা হিসেবে উঠে আসছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ চর্চার সুযোগ পেলে কী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, তার এক বাস্তব উদাহরণ রিয়াদ। প্রশাসন, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের একযোগে কাজ করতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো রিয়াদ জন্ম না নেয়—যে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে সমাজকে শোষণ করে।