রাষ্ট্রদ্রোহিতায় খায়রুলসহ ৪ প্রধান বিচারপতির হতে পারে মৃত্যুদণ্ড
- Update Time : ১১:১৬:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ জুলাই ২০২৫
- / ৩৪১ Time View

প্রধান বিচারপতির আসনে বসে রাজনীতি: এক সাংবিধানিক বিশ্বাসঘাতকতা
এ বি এম খায়রুল হক ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একটি নিরপেক্ষ ও সংবিধান-নির্ধারিত পদে থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। ‘প্রধান বিচারপতি’ পদটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সর্বোচ্চ দায়িত্বে নিয়োজিত একজন ব্যক্তির পদ, যার কাজ হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনি ব্যাখ্যা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু খায়রুল হক শপথ নিয়ে সেই দায়িত্ব পালনের বদলে কার্যত একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনের নীলনকশা বাস্তবায়নে সহযোগী হয়েছেন। তিনি বিচারকের কোর্ট থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা সংবিধান, ন্যায়বিচার ও জনগণের ওপর চরম অবিচারের শামিল। শপথ অনুযায়ী তাকে থাকতে হতো নিরপেক্ষ, কিন্তু তিনি হয়ে উঠেছিলেন একদলীয় শাসনের মুখপাত্র। এটি কেবল পেশাগত শঠতা নয়, এটি ইতিহাসের কাছে এক ন্যক্কারজনক বিশ্বাসঘাতকতা।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ: আইনি ভিত্তি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা
২০১১ সালে সংবিধানে সংযোজিত অনুচ্ছেদ ৭–ক বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এতে বলা হয়—কোনো ব্যক্তি যদি অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সংবিধান রদ, রহিত বা বাতিল করেন, কিংবা ষড়যন্ত্র করেন, তবে তা হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং এর শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। এই আইনি কাঠামোর আওতায় বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করা অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি সরাসরি একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা, অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, বাতিল করে এমন একটি শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন, যা দেশের জনগণের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারকে সরাসরি হরণ করেছে। তিনি রাষ্ট্রকে এমন একটি পথে ঠেলে দিয়েছেন, যার ফলাফল জনগণের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
সহ–অপরাধী হিসেবে আরও তিনজন বিচারপতির ভূমিকা
খায়রুল হক একা ছিলেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সিদ্ধান্তে তার সঙ্গে বেঞ্চে আরও ছিলেন বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেন, এস কে সিনহা ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এই চারজন মিলে একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপর্যস্ত করেন। তারা সবাই রায়ে স্বাক্ষর করে সংবিধানের নিরপেক্ষতা, জনগণের আস্থা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছেন। এই বেঞ্চের সদস্যরা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক স্তম্ভ—নির্বাচন ব্যবস্থা—কে নিঃশেষ করে দিয়েছেন। তাই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে খায়রুল হকের পাশাপাশি বাকি তিনজন বিচারপতিকেও অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত করা আবশ্যক। এদের বিচারের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।
শাস্তির আইনি সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ধারা ২১৯ অনুযায়ী, কোনো বিচারক যদি জেনে-বুঝে বেআইনি রায় দেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সুযোগ রয়েছে। সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, যদি একই বিচারক একাধিক বেআইনি রায় দেন, তাহলে একাধিক মামলা করা যেতে পারে। প্রতিটি মামলার সাজা একটির পর আরেকটি কার্যকর করা হলে আমৃত্যু কারাবাস নিশ্চিত করা সম্ভব। খায়রুল হকের ক্ষেত্রে এ ধরনের অসংখ্য বেআইনি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়ের নজির রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষক হওয়া অস্বীকার, ইতিহাস বিকৃতি, খালেদা জিয়ার উচ্ছেদের রায় ইত্যাদি তার শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরা যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও পর্যন্ত এ ধরনের একটি মামলাও দায়ের হয়নি, যা বিচার বিভাগের রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং সরকারের অনীহা প্রকাশ করে।
ধামাচাপা দেওয়া ও সময়মতো গ্রেফতার না করার পেছনে রাজনীতি
খায়রুল হকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে এত বিলম্ব কেন—এই প্রশ্ন আজ সব মহলে আলোচিত। কেন তাকে এক দশক ধরে ছাড় দিয়ে রাখা হলো? কেন মাইলস্টোন কলেজের ভয়াবহ দুর্ঘটনার সময় তাকে গ্রেফতার করে জনসচেতনতা অন্যদিকে সরানো হলো? অনেকেই মনে করেন, এটি শেখ হাসিনা সরকারের পুরনো কৌশল। যখনই সরকার চাপে পড়ে, তখনই তারা জনগণের নজর ঘোরাতে বড় কোনো ইস্যু সামনে আনে। এইবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্লেন দুর্ঘটনায় দেশের মানুষ যখন শোকে স্তব্ধ, তখন খায়রুল হকের গ্রেপ্তারের খবর দিয়ে সেটিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে করে সরকারের সদিচ্ছা নয়, বরং লোক দেখানো ন্যায়ের ছায়া বেশি প্রতীয়মান হয়।
জনগণের ঘৃণা ও প্রতিক্রিয়া: এক গণআবেগ
এ বি এম খায়রুল হকের গ্রেপ্তারের পর দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা দেখা দেয়। যেসব মানুষ তার রায়ের ফলে রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, খুন, ভুয়া মামলা ও দেশান্তরের শিকার হয়েছেন, তারা এই গ্রেফতারকে অনেক দেরিতে আসা এক বিচারের সূচনা হিসেবে দেখলেও আশঙ্কাও করছেন—এই বিচার কি আদৌ সম্পূর্ণ হবে? এ ঘৃণা এতটাই গভীর যে কোনো আইনজীবী তার পক্ষে দাঁড়াতে রাজি হননি। এরকম সামাজিক ও পেশাগত বয়কট শুধুই তার অবিচার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি জাতির পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রতীকী প্রতিশোধও।
ইতিহাস বিকৃতি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়: চরম বেআইনি দৃষ্টান্ত
খায়রুল হকের সবচেয়ে বিতর্কিত রায়গুলোর একটি হলো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে অস্বীকার করে শেখ মুজিবুর রহমানকে একক ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এ রায়ের মাধ্যমে তিনি একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’–এর তৃতীয় খণ্ড বাতিল করেন এবং তা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। এটি কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়, বরং একধরনের রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণের প্রয়াস, যা শুধুমাত্র শাসকগোষ্ঠীর সুবিধা রক্ষায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। এ ধরনের রায় দেশের শিক্ষা, গবেষণা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে ভেঙে দেয়। অথচ এর জন্য কোনো শাস্তির বিধান এখনো আইনের মধ্যে নেই, যা একটি বড় আইনি ফাঁক ফোকর।
শাস্তির দাবি এখন শুধু ন্যায়বিচারের দাবি নয়, এটি রাষ্ট্র রক্ষার দাবি
খায়রুল হকের বিচার শুধু তার ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—বিচার বিভাগ—কীভাবে রাজনৈতিক শাসকদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, তার বিচারও বটে। তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে আরও অনেক ‘খায়রুল হক’ তৈরি হবে, যারা আবারো ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করবে। তাই এই বিচার শুধু প্রয়োজনীয় নয়, এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রক্ষা, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত জরুরি।
এইভাবে বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, শপথ ভঙ্গ, ইতিহাস বিকৃতি, বেআইনি রায়, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে একগুচ্ছ মামলা দায়ের করে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে গণতন্ত্র, আইন ও ইতিহাস—সবকিছুর মৃত্যু ঘটবে। এখন সময়, খায়রুল হকের বিচার করে জাতির সামনে একটি নতুন উদাহরণ স্থাপন করার। জনগণ দেখছে, শাসক ও ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে কে জয়ী হয়।














