মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ সরিয়ে নেওয়া জরুরি: দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন জননিরাপত্তা ও পরিকল্পনায়, দায় কতটা রাষ্ট্রের?
- Update Time : ১১:৩৬:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
- / ২০১ Time View

২১ জুলাই ২০২৫, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের চত্বরে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার রক্তাক্ত অভিঘাত কেবল নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি নগর পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ভয়ংকর ঘাটতির এক নির্মম বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) জরুরি ভিত্তিতে একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে—‘মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা : জননিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়’ শিরোনামে। ২৫ জুলাই, শুক্রবার ঢাকার বাংলামোটরে বিআইপির নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। এতে উঠে আসে এক ভয়াবহ পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা, যার দায় সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র এবং তার বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
কারিগরি বৈধতা বনাম বাস্তবিক ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুল কারিগরি অনুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের “অ্যাপ্রোচ এরিয়া”-র মধ্যে পড়ে, যেখান দিয়ে প্রতিদিন শত শত উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে এই অঞ্চলে জনবহুল ভবন নির্মাণ, বিশেষ করে শিক্ষা, ধর্মীয় বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এমন স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
তথ্য অনুযায়ী:
- বিমানবন্দরের রানওয়ের পর প্রথম ৫০০ ফুট এলাকায় কোনো স্থাপনাই নির্মাণযোগ্য নয়।
- এরপরের প্রায় ১৩,000 ফুট (প্রায় ৪ কিলোমিটার) অঞ্চলকে ধরা হয় অ্যাপ্রোচ এরিয়া, যেখানে ১৫০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমতি থাকলেও ব্যবহারবিধি সংক্রান্ত কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে—এমন জনবহুল, শিক্ষার্থীতে পরিপূর্ণ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে এই এলাকার মধ্যে অনুমোদিত হলো? শুধু উচ্চতা নয়, জনসমাগমের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না কি?
রাজউকের ড্যাপ পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা
বিআইপির পরিকল্পনাবিদ তামজিদুল ইসলাম বলেন,
“রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপে অ্যাপ্রোচ এরিয়ার ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করা হলেও, ভূমির ব্যবহারবিধি উল্লেখ নেই। ফলে ওই অঞ্চলে আবাসিক ভবন, স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ—সব কিছু গড়ে উঠছে, যা চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।”
এটি প্রমাণ করে, ঢাকার নগর উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে তা নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
আন্তর্জাতিক মানে কোথায় পিছিয়ে আমরা?
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদর্শ পরিকল্পনায় দেখা যায়, বিমানবন্দর সাধারণত শহর থেকে দূরে, ঝুঁকিমুক্ত এলাকায় গড়ে তোলা হয়। রানওয়ে ও অ্যাপ্রোচ এরিয়ায় নির্ধারিত উচ্চতা, ভূমি ব্যবহার, নির্মাণ সামগ্রী, এবং পাখি আকর্ষণকারী পরিবেশ যেন না হয়—এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে।
কিন্তু ঢাকায় বিমানবন্দরের আশপাশে আবাসিক এলাকা, বহুতল ভবন, স্কুল-কলেজ, শপিং মল, এমনকি মার্কেটও দেখা যায়। এই ব্যবস্থাপনা কেবল পরিকল্পনাগত ব্যর্থতা নয়—এটি দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ।
জনসমাগম হয় এমন সব স্থাপনা সরাতে হবে
বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন,
“অ্যাপ্রোচ এরিয়ায় স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদসহ যেসব স্থাপনায় জনসমাগম হয়, তা অবিলম্বে সরিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তা ঠেকানো অসম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“যেসব ভবন উচ্চতা বা অনুমোদন ব্যত্যয়ের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে, সেগুলোর অতিরিক্ত অংশ ভেঙে ফেলতে হবে এবং তদন্ত করে দেখাতে হবে কে কে দায়ী।”
এটি শুধু নিরাপত্তা নয়, নৈতিকতা এবং মানবিকতার বিষয়ও বটে।
প্রশিক্ষণ বিমান চালনায়ও অনিয়ম
এছাড়া বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন—জনবহুল এলাকায় কীভাবে প্রশিক্ষণ বিমান চালনা অনুমোদন পেল? এটা যে কোনো মুহূর্তে গণহত্যার কারণ হতে পারত। প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চল থাকা উচিত—যেখানে কোনো নাগরিক বসতি নেই, এবং দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি শূন্যের কোঠায় থাকে।
রাষ্ট্রের দায় ও জরুরি করণীয়
এই দুর্ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে অসতর্কতা, অব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পনাগত অবহেলা সবই মিলে ভয়াবহ একটি মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। রাষ্ট্রের এখন জরুরি করণীয়:
- অ্যাপ্রোচ এরিয়ার পুরোটাই পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সকল স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে।
- রাজউক, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা গঠন করতে হবে, যেখানে ভূমির ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে।
- দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
- দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারকে দ্রুত ও পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ এলাকায় স্থানান্তরের জন্য প্রণোদনা ও সরকারি সহায়তা দিতে হবে।
- ভবিষ্যতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিমান চলাচল নিরাপত্তা পরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হবে।
এ দায় কার, এ দায়িত্ব কাদের?
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ওপর যুদ্ধবিমানের বিধ্বস্ত হয়ে শতাধিক জীবন বিপর্যস্ত হওয়ার ঘটনা এক অজুহাত নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার নগ্ন প্রকাশ। উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে শহরের বুকজুড়ে যা কিছু গড়ে উঠেছে, তা যেন যেনতেনভাবে অনুমোদিত এক ভবিষ্যৎ বিভীষিকার প্রতিচ্ছবি।
এই একটিমাত্র দুর্ঘটনাই যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল আমাদের জাগানোর জন্য। যদি এখনো না জাগি, যদি না বদলাই, তবে আরেকটি মাইলস্টোন, আরেকটি ট্রাজেডি আমাদের অপেক্ষায় থাকবে। রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ—দুই পক্ষকেই এখন সাহসী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জীবন সবার আগে, উন্নয়ন নয়। পরিকল্পনা করতে হবে মানুষের নিরাপত্তা মাথায় রেখে—not for profit, but for people.













