খেতে না পেয়ে রাস্তায় অজ্ঞান গাজাবাসী: মানবিক বিপর্যয়ের চরমে ফিলিস্তিন
- Update Time : ০২:২৫:৪১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
- / ১৪১ Time View

খেতে না পেয়ে রাস্তায় অজ্ঞান গাজাবাসী: মানবিক বিপর্যয়ের চরমে ফিলিস্তিন
বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন | সূত্র: ডয়চে ভেলে, আল–জাজিরা, গার্ডিয়ান, জাতিসংঘ রিপোর্টস
গাজা উপত্যকায় এখন যে মানবিক বিপর্যয় চলছে, তা কেবল সংকট নয়—এ যেন ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। প্রতিদিনের ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই ভূখণ্ডে আজ মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুধার কাছে হার মানছে। খাবার না পেয়ে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছে বহু মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অগণিত ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার্ত শিশু-কিশোর কিংবা বৃদ্ধরা চেতনাহীন অবস্থায় পড়ে আছেন গাজার রাস্তায়।
সীমান্ত বন্ধ, ত্রাণ আটকে: মানবিক সহায়তা প্রায় অকার্যকর
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, গাজা উপত্যকায় সীমিত সংখ্যক ত্রাণ ট্রাক ঢুকতে দিচ্ছে ইসরায়েল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল গাজার অধিকাংশ সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। একমাত্র রাফা সীমান্তও বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করা প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে গড়ে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০টি ট্রাক ঢুকছে, যার মধ্যে অধিকাংশেই থাকে কেবল সামান্য পানি ও শুকনো খাবার। এ ছাড়া গ্যাস, তেল ও চিকিৎসা সামগ্রীর ঘাটতিও প্রকট। [সূত্র: UNOCHA, July 2025]
‘‘আজ কী খাওয়াবো?’’ — গাজার মানুষ এখন এই প্রশ্নে বাঁচে
গাজার বাসিন্দা রাইদ আল-আথামনা এক সময় বিদেশি সাংবাদিকদের গাড়িচালক ছিলেন। এখন তার জীবিকা নেই। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সারাদিন একটি কথাই মাথায় ঘোরে, আজ কী খাবো, আর কী খাওয়াবো আমার স্ত্রী আর নাতিনাতনিদের?”
তিনি আরও জানান, “রুটি তো দূরের কথা, সামান্য আটাও কিনতে পারি না। যদি কিছু পাওয়া যায়ও, তা এত দামি যে আমার পক্ষে কেনা সম্ভব না। গতকাল ডাল কিনেছিলাম, আজ কিছুই নেই।”
যুদ্ধবিমান আর শেলিংয়ের ভয়াবহতা
গাজা শহরের আকাশপ্রদূষিত বাতাসে প্রতিদিন গর্জে ওঠে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। আল–জাজিরা’র তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে গাজায় গড়ে প্রতিদিন ৭০টিরও বেশি বিমান হামলা হয়েছে। এই হামলায় ধ্বংস হয়েছে স্কুল, হাসপাতাল, বাসস্থানসহ সব ধরনের বেসামরিক অবকাঠামো।
আথামনা বলেন, “আমরা দিনে এক জায়গায় আশ্রয় নিই, রাতে অন্যত্র। কিন্তু কোনো জায়গায় নিরাপদে থাকা যায় না। ঘুম নেই, খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই। এই অবস্থায় মানুষ আর কতদিন বাঁচবে?”
ক্ষুধায় অজ্ঞান—একটি নতুন ট্রাজেডির চিত্র
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করেছে মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch (HRW)। তারা নিশ্চিত করেছে, এগুলো গাজারই ভিডিও, যেখানে দেখা যাচ্ছে ক্ষুধার্ত শিশু ও বৃদ্ধরা রাস্তায় পড়ে আছেন অজ্ঞান অবস্থায়। কেউ কেউ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। আশেপাশে কেউ নেই সহায়তার জন্য। [সূত্র: HRW Media Monitoring Report, July 2025]
তিন মাসের বিরতি, আবারও অবরোধ
গত মে মাসে একবার ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল ইসরায়েল। তখন মনে হয়েছিল, গাজার ২০ লাখ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে। কিন্তু আথামনার মতে, “সে ছিল কেবল একটুখানি আশার আলো। এখন আবার অন্ধকার। আজকের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। এক টুকরো রুটির জন্য মানুষ লড়াই করছে।”
শিশুরা কাঁদছে, বাবা–মায়েরা হতাশ
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, “ক্ষুধায় কাঁদছে শিশু-কিশোররা। বাবা-মা তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। তাদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারার ব্যর্থতায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন বহু পিতা।”
আথামনা বলেন, “আমি নিজে চোখে দেখেছি কীভাবে ক্ষুধার্ত শিশু রাস্তায় পড়ে আছে। আমার নিজের নাতনাতনিরা সারাক্ষণ কাঁদছে। আমি পারি না তাদের কিছু দিতে। প্রতিটি দিন আমার কাছে একটি আতঙ্ক।”
গাজা এখন মানবিক বিবেকের চরম পরীক্ষায়
গাজা আজ শুধুই একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এটি মানবতার লজ্জা। এখানে মানুষ বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত। ক্ষুধা, ভয়, গুলি আর ধ্বংসই তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অবিলম্বে পূর্ণ মানবিক করিডোর খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র:
- Deutsche Welle: [DW.com – Gaza Humanitarian Crisis Report, July 2025]
- Al Jazeera: [aljazeera.com – Gaza Strip daily air raids update]
- United Nations OCHA: [ocha.org – Gaza Humanitarian Aid Assessment]
- Human Rights Watch: [hrw.org – Gaza Civilian Impact Documentation]
- The Guardian: [theguardian.com – Eyewitness accounts from Gaza hunger crisis]













