উত্তরায় ছেলেকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া সেই মায়ের লাশ শনাক্ত হলো ডিএনএ পরীক্ষায়
- Update Time : ১০:৪০:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুলাই ২০২৫
- / ২১০ Time View

ঢাকার উত্তরা এলাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সংঘটিত ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় ছেলেকে আনতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া মা আফসানা প্রিয়া অবশেষে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বিকেলে তার লাশ শনাক্ত করা হয়।
মাত্র ৯ বছর বয়সী আফসান ওহী, যিনি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, ওই দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফিরলেও তার মা, ৩০ বছর বয়সী আফসানা প্রিয়া, সেই দিন থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তীতে উদ্ধার হওয়া একটি অজ্ঞাত নারীর ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কি না তা নিশ্চিত করতে পরিবারকে ডিএনএ পরীক্ষায় অংশ নিতে বলা হয়।
নিহত আফসানা প্রিয়া গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর ইউনিয়নের মেদীআশুলাই গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী আবদুল ওহাব মৃধা একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী। প্রতিদিনের মতো গত সোমবার সকালেও প্রিয়া ছেলেকে স্কুলে দিয়ে অভিভাবকদের নির্ধারিত কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইলস্টোন স্কুলের একটি ভবনে আছড়ে পড়ে, সেখান থেকে শুরু হয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড।
দুর্ঘটনার সময় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় হাহাকার। চারদিকে ধোঁয়া, আগুন এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। আফসান ওহীকে সেখান থেকে উদ্ধার করা গেলেও তার মায়ের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আতঙ্ক, কান্না ও অজানা আশঙ্কায় পুরো পরিবার দিন পার করছিল।
নিহত আফসানার চাচা তাজুল ইসলাম জানান, “আমার ভাতিজি প্রিয়ার ওপরেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল। এ কারণে তার দেহ এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় যে, চেনার কোনো উপায় ছিল না। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা লাশটি এতটাই বিকৃত ছিল যে প্রাথমিকভাবে কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি সেটি প্রিয়ার কিনা।”
পরিবারের আবেদনের পর গত মঙ্গলবার (২২ জুলাই) নিহতের বাবা আব্বাস উদ্দিন ও মা মিনু বেগমকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ ডেকে নিয়ে গিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত লাশের সঙ্গে তাদের জিনগত মিল পাওয়া যায়, যা নিশ্চিত করে যে এটি নিখোঁজ আফসানা প্রিয়ারই দেহাবশেষ।
পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার হাসপাতালে গিয়ে লাশ বুঝে নেন। স্বজনদের মধ্যে তখন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রিয়ার মা ও বাবা। ছোট্ট আফসান ওহী তখনও পুরো বিষয়টা বুঝে উঠতে পারছে না—সে শুধু তার মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে প্রিয়ার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কার্যক্রম ও আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সমন্বয়ের অভাব ছিল। তারা এ ঘটনায় যথাযথ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে রাজধানীর অভ্যন্তরে এ ধরনের যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণের নিরাপত্তা, স্কুল-কলেজের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ উড্ডয়ন, এবং দুর্যোগ পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে। পাশাপাশি একজন মায়ের বুকফাটা কান্না এবং একটি শিশুর জীবনের চরম ক্ষতির এই ঘটনা দেশের সচেতন মহল ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আফসানা প্রিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উত্তরার ওই বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল দুই জনে, যার মধ্যে তিনি একমাত্র পরিচিত অভিভাবক। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, উদ্ধারকৃত ছাইভস্মের ভেতর আরও দেহাবশেষ থাকতে পারে, যার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে।
প্রিয়ার মৃত্যুতে মেদীআশুলাই গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার শ্বশুরবাড়িতে বৃহস্পতিবার রাতে জানাজা শেষে দাফনের আয়োজন করা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে গ্রামের বাতাস। একজন মায়ের সাহসিকতা, দায়বদ্ধতা এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সন্তানের পাশে থাকার অদম্য ভালোবাসা দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।













