সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আটক: রাজনীতির বিতর্কিত চরিত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ একাধিক মামলা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:০০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
  • / ১৮১ Time View

khairul haque

 

khairul haque

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আজ বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সকাল সাড়ে আটটার দিকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ধানমন্ডির একটি বাসভবনে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

ডিবি যুগ্ম কমিশনার মো. নাসিরুল ইসলাম খায়রুল হকের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় মোট তিনটি মামলা রয়েছে। এর যেকোনো একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।”

মামলার পটভূমি অভিযোগ

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো রাষ্ট্রদ্রোহ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে রায় প্রদান। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রায়কে প্রভাবিত করে রাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এই মামলার বাদী ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল বারী ভূঁইয়া। মামলাটি দায়ের হয় ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট।

এছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতেও তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা রয়েছে, যার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, মামলাগুলোর সবকটিতেই রাষ্ট্রের আইন সংবিধান লঙ্ঘন করার অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক সমালোচনা

খায়রুল হক ছিলেন দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি। ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি এ পদে নিয়োগ পান এবং কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে। তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ২০১১ সালের ১৭ মে।
তবে বিচারক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে থাকা অবস্থায় তিনি যে রায় দেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চরম বিতর্ক তৈরি করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে যে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

এছাড়াও তিনি ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় দেন, যা একদিকে প্রশংসিত হলেও, অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

পরবর্তী অধ্যায়: আইন কমিশন পদত্যাগ

খায়রুল হক অবসরের পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাঁকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বছরের জন্য। পরবর্তীতে তাঁর মেয়াদ কয়েকবার বাড়ানো হয়। তবে ২০২4 সালের ১৩ আগস্ট তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তাঁর পদত্যাগ এবং বর্তমান মামলাগুলোর মধ্যে একটি যোগসূত্র থাকতে পারে।

গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

খায়রুল হকের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল মনে করে, দেশের বিচার ব্যবস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের পেছনে খায়রুল হকের ভূমিকা ছিল অন্যতম। অন্যদিকে, সরকারপন্থী অনেকেই দাবি করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ার অংশ এবং গ্রেপ্তার যৌক্তিক।

দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতির এই গ্রেপ্তার বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অতীত সিদ্ধান্তগুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, এবং বিচারিক তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এখন প্রশ্ন উঠছে—একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যদি এমন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে দেশের বিচার ও আইনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আদৌ কোথায় দাঁড়িয়ে? বিচারপতি খায়রুল হকের গ্রেপ্তার তাই কেবল একজন ব্যক্তির ঘটনা নয়, এটি দেশের আইন ও ন্যায়ের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আটক: রাজনীতির বিতর্কিত চরিত্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ একাধিক মামলা

Update Time : ১২:০০:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫

 

khairul haque

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে রাজধানীর ধানমন্ডি থেকে আজ বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সকাল সাড়ে আটটার দিকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ধানমন্ডির একটি বাসভবনে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

ডিবি যুগ্ম কমিশনার মো. নাসিরুল ইসলাম খায়রুল হকের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় মোট তিনটি মামলা রয়েছে। এর যেকোনো একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।”

মামলার পটভূমি অভিযোগ

খায়রুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো রাষ্ট্রদ্রোহ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে রায় প্রদান। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রায়কে প্রভাবিত করে রাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। এই মামলার বাদী ছিলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল বারী ভূঁইয়া। মামলাটি দায়ের হয় ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট।

এছাড়া রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতেও তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা রয়েছে, যার প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে জানা গেছে, মামলাগুলোর সবকটিতেই রাষ্ট্রের আইন সংবিধান লঙ্ঘন করার অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক বিতর্ক সমালোচনা

খায়রুল হক ছিলেন দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি। ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি এ পদে নিয়োগ পান এবং কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে। তাঁর মেয়াদ শেষ হয় ২০১১ সালের ১৭ মে।
তবে বিচারক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল সংক্রান্ত রায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে থাকা অবস্থায় তিনি যে রায় দেন, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চরম বিতর্ক তৈরি করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী রাজনৈতিক দল অভিযোগ করে যে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

এছাড়াও তিনি ফতোয়া অবৈধ ঘোষণা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় দেন, যা একদিকে প্রশংসিত হলেও, অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

পরবর্তী অধ্যায়: আইন কমিশন পদত্যাগ

খায়রুল হক অবসরের পর ২০১৩ সালের ২৩ জুলাই তাঁকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তিন বছরের জন্য। পরবর্তীতে তাঁর মেয়াদ কয়েকবার বাড়ানো হয়। তবে ২০২4 সালের ১৩ আগস্ট তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তাঁর পদত্যাগ এবং বর্তমান মামলাগুলোর মধ্যে একটি যোগসূত্র থাকতে পারে।

গ্রেপ্তারের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

খায়রুল হকের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি বিরোধী দল মনে করে, দেশের বিচার ব্যবস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের পেছনে খায়রুল হকের ভূমিকা ছিল অন্যতম। অন্যদিকে, সরকারপন্থী অনেকেই দাবি করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে তা আইনানুগ প্রক্রিয়ার অংশ এবং গ্রেপ্তার যৌক্তিক।

দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতির এই গ্রেপ্তার বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং অতীত সিদ্ধান্তগুলোকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, এবং বিচারিক তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এখন প্রশ্ন উঠছে—একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যদি এমন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তবে দেশের বিচার ও আইনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা আদৌ কোথায় দাঁড়িয়ে? বিচারপতি খায়রুল হকের গ্রেপ্তার তাই কেবল একজন ব্যক্তির ঘটনা নয়, এটি দেশের আইন ও ন্যায়ের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে।