আল জাজিরার অনুসন্ধান: ‘জুলাইয়ের ৩৬ দিন’—হাসিনার শাসনের অন্তিম নাট্যপ্রবাহ ও নৃশংস দমনযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র
- Update Time : ১২:১৫:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
- / ১০৭ Time View

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিট সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম—‘হাসিনা: জুলাইয়ের ৩৬ দিন’। এই প্রতিবেদনে গোপনে রেকর্ডকৃত একাধিক ফোনালাপ, অডিও দলিল, গোপন নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি দমনপীড়নের ভয়াবহ ও নৃশংস রূপ।
গোপন ফোনালাপে প্রাণঘাতী নির্দেশের প্রমাণ
প্রামাণ্যচিত্রে সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো শেখ হাসিনার একটি ফোনালাপ, যেখানে তিনি সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিচ্ছেন। আল জাজিরা দাবি করে, ওই ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে বলেন:
“আমার নির্দেশনা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। আমি খোলা আদেশ দিয়েছি। এখন তারা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করবে। যেখানেই পাবে, গুলি চালাবে।”
এই বক্তব্য যে সময় রেকর্ড করা হয়, তখন চলছিল ছাত্রদের আন্দোলনের চরম উত্তেজনা, যা শুরু হয়েছিল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার তারিখ আকস্মিক পরিবর্তনকে ঘিরে। তবে খুব দ্রুতই তা রূপ নেয় রাষ্ট্রবিরোধী নিপীড়নবিরোধী গণআন্দোলনে।
হেলিকপ্টার থেকে গুলি, সহস্রাধিক নিহত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তিন সপ্তাহের আন্দোলনে প্রায় ১,৫০০ জন নিহত, ২৫,০০০ জন আহত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৩০ লাখ রাউন্ডের বেশি গুলি ছোড়ে। একাধিক সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানায়, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়—যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ উদাহরণ।
একজন চিকিৎসক প্রামাণ্যচিত্রে বলেন, “যেসব লাশ আমরা পেয়েছি, তাদের শরীরে উপরের দিকে থেকে ঢোকা গুলির চিহ্ন ছিল। এটা হেলিকপ্টার থেকে গুলির স্পষ্ট প্রমাণ।”
ছাত্র আবু সাইয়েদের মৃত্যু ও ‘গোপন অপারেশন’
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে ছাত্র আবু সাইয়েদের হত্যাকাণ্ড ও তা ধামাচাপা দেওয়ার প্রক্রিয়া। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়, কিন্তু পরে পুলিশ
আল জাজিরার রিপোর্টে বলা হয়, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এই ঘটনাটিকে গোপন রাখতে পাঁচবার ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। রিপোর্ট থেকে বুলেটের অস্তিত্ব মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। নিহতের পরিবার রাষ্ট্রীয় চাপে শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হয়, যেখানে তারা কোনো অভিযোগ না তোলার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হন।
ইন্টারনেট বন্ধ ও তথ্য গোপনের ষড়যন্ত্র
আল জাজিরার অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে সহিংসতার ছবি ও ভিডিও বিশ্বমিডিয়ায় পৌঁছানো রোধ করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর গোপন নির্দেশনা, যা আল জাজিরা হাতে পেয়েছে, তাতে দেখা যায়, বিশেষভাবে ইউটিউব, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ সার্ভার আংশিকভাবে ব্লক করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগ এই অনুসন্ধানকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনোই প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেননি। ১৮ জুলাইয়ের কথিত ফোনালাপটি ভুয়া ও মনগড়া।”
তবে তারা আবু সাইয়েদের পরিবারের দুঃখজনক অভিজ্ঞতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়াও দাবি করেছে, আন্দোলনকারীদের নৈরাজ্য ঠেকাতেই সাময়িকভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য ফলাফল
‘হাসিনা: জুলাইয়ের ৩৬ দিন’ প্রকাশের পর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংগঠনগুলো নড়েচড়ে বসেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ইতিমধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অনুসন্ধান শেখ হাসিনার শাসনকালের শেষ অধ্যায়কে চিহ্নিত করবে ইতিহাসে একটি গভীর দমনমূলক, অমানবিক ও জনবিচ্ছিন্ন সময় হিসেবে।
আল জাজিরার এই অনুসন্ধান কেবল একটি সাংবাদিকতার সাফল্য নয়, এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের বাস্তব চিত্রের নগ্ন উন্মোচন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ওপর নতুন করে আন্তর্জাতিক চাপ আসতে পারে এই প্রামাণ্যচিত্রের সূত্র ধরে।
যে রাষ্ট্রের ছাত্রদের কণ্ঠরোধ করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালাতে হয়, সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা আদৌ গণতান্ত্রিক থাকতে পারে কি না—এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বে গর্জে উঠেছে।













