উত্তরায় মিলেস্টোন কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত: দায় কার?,কী করণীয়?
- Update Time : ০৮:০০:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ জুলাই ২০২৫
- / ২০৯ Time View

২০২৫ সালের ২১ জুলাই, সোমবার দুপুর আনুমানিক ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা শহরের ঘনবসতিপূর্ণ উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় অবস্থিত মাইলস্টোন কলেজ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭বিজি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় পাইলট ইজেক্ট করে প্রাণে বেঁচে গেলেও, স্থানীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা কলেজ ভবনের মূল ফটকে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের কারণে আটকা পড়ে যায় এবং অনেকেই আহত হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।
এই ঘটনা শুধু একটি প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি সামরিক প্রশিক্ষণ, নগর পরিকল্পনা ও নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতার নগ্ন উদাহরণ হিসেবে জাতির সামনে এসেছে।
দায় কার?
১. বিমান বাহিনী ও প্রশিক্ষণ নীতিমালা:
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এই ঘটনাকে একটি “রুটিন প্রশিক্ষণ মিশন” বলে উল্লেখ করলেও, প্রশ্ন উঠেছে—এই ‘রুটিন’ প্রশিক্ষণ কেন একটি ঘনবসতিপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঘেঁষা এলাকায় পরিচালিত হচ্ছিল? ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রতিবেদনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ‘No Fly Zone’ বা ‘Restricted Airspace’ নির্ধারিত থাকে, যেখানে জনবসতি নেই এবং দুর্ঘটনা ঘটলে জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা কম থাকে।
২. পুরনো যুদ্ধবিমান ও রক্ষণাবেক্ষণ:
দৈনিক সমকাল ও যুগান্তর জানায়, F-7BG যুদ্ধবিমানটি মূলত চীনা প্রযুক্তির একটি পুরনো মডেল, যা ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। বিমান বাহিনী ২০০৬ সালে এই মডেলটি সংগ্রহ করেছিল এবং এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার এই ধরনের বিমান দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বয়সপ্রাপ্ত যুদ্ধবিমানগুলো এখনো কীভাবে প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে?
৩. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা:
বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিমান চলাচল সংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট সমন্বয় না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা পূর্বে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ফ্লাইটের বিষয়ে অবহিত ছিল না। এটি বোঝায়, আন্তঃপ্রতিষ্ঠানীয় যোগাযোগ ও তথ্য ভাগাভাগির অভাব রয়েছে।
কী করণীয়?
১. স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন:
সরকারের উচিত একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা, যাতে প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা, প্রশিক্ষণ নীতির গাফিলতি, এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাগুলো বিশ্লেষণ করা যায়। এই কমিটিতে সামরিক-বেসামরিক প্রতিনিধি, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
২. নিরাপদ প্রশিক্ষণ এলাকা নির্ধারণ:
ভারতের ‘গ্বালিয়র এয়ারবেস’ বা যুক্তরাষ্ট্রের ‘এডওয়ার্ডস এয়ার ফোর্স বেস’-এর মতো বাংলাদেশেও জনবসতি থেকে দূরে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এলাকা নির্ধারণ করা জরুরি। এমন এলাকা হতে হবে যেখানে দুর্ঘটনার সম্ভাবনায় সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে না।
৩. পুরনো যুদ্ধবিমান পর্যবেক্ষণ ও বাতিল:
বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেজর (অব.) হাফিজ আহমেদ এক প্রতিবেদনে বলেন, “একটি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর দক্ষতা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। পুরনো বিমান শুধু ঝুঁকিই নয়, বরং দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।” তাই এফ-৭ বিমানের মতো পুরনো যন্ত্রপাতি দ্রুত পর্যালোচনা করে বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. নাগরিক এলাকায় ফ্লাইট নিষিদ্ধ:
সার্কভুক্ত দেশগুলোতে নাগরিক এলাকায় উচ্চগতির যুদ্ধবিমান ফ্লাইট নিষিদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশেও এই ধরণের কঠোর নীতিমালা এখন সময়ের দাবি।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও নীতিমালা:
মাইলস্টোন কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়, সেজন্য আকাশপথে বিমান চলাচলের উপর নির্দিষ্ট সময় ও অঞ্চলভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজ সংলগ্ন এলাকার জন্য একটি ‘Educational Safety Air Corridor’ নির্ধারণ করা যেতে পারে।
মাইলস্টোন কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি, এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয়ের কত বড় ফাঁকফোকর এখনো থেকে গেছে। একটি রাষ্ট্রে জননিরাপত্তা কখনোই প্রশিক্ষণের চেয়েও গৌণ হতে পারে না। এটি একটি সিগন্যাল—আমাদের প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সময়োপযোগী সংস্কার দরকার।
এই দুর্ঘটনার দায় এড়ানো কোনো পক্ষের জন্যই সম্ভব নয়। একটি জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা রোধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা।
তথ্যসূত্র:
- দ্য ডেইলি স্টার, ২১ জুলাই ২০২৫
- প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০২৫
- বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২২ জুলাই ২০২৫
- সমকাল, ২১ জুলাই ২০২৫
- ইউএনবি নিউজ সার্ভিস
- দৈনিক ইনকিলাব, ২২ জুলাই ২০২৫
- অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন, ২০২৪













