যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি বিক্রি করছেন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠরা, গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য
- Update Time : ১০:৩২:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
- / ১৫০ Time View

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই পালাবদলের রাজনীতি ও তার অভিঘাতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ছিল নজরে। সেই প্রেক্ষাপটে একটি নতুন মোড় তৈরি করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ও আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর এক যৌথ অনুসন্ধান, যেখানে দাবি করা হয়েছে—পতন ঘটার পর যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, এমপি ও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই এখন গোপনে তাদের সম্পদ বিক্রি বা স্থানান্তর করছেন।
অর্থপাচারের অভিযোগ ও ব্রিটিশ তদন্ত সংস্থার তৎপরতা
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুরোধে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA) অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে জড়িত বাংলাদেশিদের সম্পদের ওপর নজরদারি ও জব্দ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায়, যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড রেজিস্ট্রি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন একাধিক ব্যক্তির সম্পত্তি নিয়ে অন্তত ২০টি লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে।
এই ধরনের আবেদনে সাধারণত সম্পত্তি বিক্রি, মালিকানা হস্তান্তর কিংবা বন্ধকের শর্ত পরিবর্তনের বিষয় থাকে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশিদের বিতর্কিত সম্পদ হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে।
বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকদের সম্পত্তি লেনদেন
গার্ডিয়ান জানায়, এই সম্পত্তি লেনদেনকারীদের মধ্যে রয়েছেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। লন্ডনের নাইটসব্রিজে অবস্থিত একটি চারতলা টাউনহাউস—যার দাম প্রায় ৭.৩৫ মিলিয়ন পাউন্ড, সম্প্রতি সন্দেহজনকভাবে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এপ্রিল মাসে এটি বিনামূল্যে হস্তান্তর করা হয়েছিল একটি কোম্পানিতে, যার মালিক লিচটেনস্টাইন ও সিঙ্গাপুরে অফিস পরিচালনা করা এক আবাসন পরামর্শক।
পরবর্তীতে ওই সম্পত্তি একটি নতুন গঠিত কোম্পানির নামে বিক্রি হয়েছে, যার পরিচালক একজন অজ্ঞাতনামা হিসাবরক্ষক। এই ধরনের কাঠামো সাধারণত ট্যাক্স ফাঁকি ও সম্পত্তি গোপন রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়।
এছাড়া, সোবহান পরিবারের আরেক সদস্য শাফিয়াত
ভূমিমন্ত্রীর ভাই ও ব্রিটিশ–বাংলাদেশি ডেভেলপার
তদন্তে উঠে এসেছে আরো এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী গত বছর রিজেন্টস পার্কের কাছের ১০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি জর্জিয়ান টাউনহাউস বিক্রি করেছেন। এছাড়া তাঁর নামে আরো তিনটি লেনদেন আবেদন জমা পড়েছে। যদিও তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এগুলোর কোনোটি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং ২০২৩ সালের শেষ দিকেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
একই তালিকায় রয়েছে একজন প্রভাবশালী ব্রিটিশ–বাংলাদেশি প্রপার্টি ডেভেলপার যাঁর পরিচয় গার্ডিয়ান প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানা গেছে, তিনিও গত এক বছরে একাধিক সন্দেহজনক সম্পত্তি হস্তান্তরে জড়িত ছিলেন।
বেক্সিমকো পরিবারও নজরদারিতে
গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে বাংলাদেশি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালক সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শায়ান রহমান ও ভাগ্নে আহমেদ শাহরিয়ার রহমান-এর নাম। মেফেয়ারের গ্রোসভেনর স্কয়ারে ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি অ্যাপার্টমেন্টসহ তাঁদের মালিকানাধীন সম্পত্তি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থা কর্তৃক জব্দ করা হয়েছে।
তবে তাঁদের আইনজীবীরা বলেছেন, তাঁদের মক্কেলরা কোনো অন্যায় কাজে যুক্ত নন এবং তারা যেকোনো তদন্তে পূর্ণ সহায়তা করতে প্রস্তুত। তাঁরা দাবি করেছেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমন-পীড়নের মধ্যে প্রতিহিংসামূলকভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে।”
তদন্তের গতি বাড়ানোর আহ্বান
যুক্তরাজ্যের সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির দুর্নীতি ও ট্যাক্স নীতিমালার প্রধান জো পাওয়েল বলেছেন, “এ ধরনের সম্পদের তদন্ত সময়মতো না করলে তা দ্রুত লোপাট হয়ে যেতে পারে।” তিনি দৃঢ়ভাবে আহ্বান জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন সম্পত্তিগুলোকে দ্রুত জব্দ করে তদন্তের গতি বাড়াতে হবে।
২০২৪ সালের সরকার পতনের পর বাংলাদেশের বিতর্কিত ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ঘনীভূত হয়েছে। গার্ডিয়ান ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই তদন্ত শুধু সম্পত্তি হস্তান্তরের চিত্রই তুলে ধরেনি, বরং যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামো ব্যবহার করে কীভাবে অস্বচ্ছ উপায়ে সম্পদ রক্ষা করা হয়—সেই গুরুতর প্রশ্নটিও সামনে এনেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই চলমান লড়াই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সফল পরিণতি নির্ভর করছে—বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যুক্তরাজ্যের তদন্ত সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর।













