সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ, গ্রেপ্তার শতাধিক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৫৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
  • / ১৪৫ Time View

b8 20250720101418

b8 20250720101418

আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
যুক্তরাজ্যে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ, গ্রেপ্তার শতাধিক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

যুক্তরাজ্য সরকার ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদে এখন পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু শনিবার (১৯ জুলাই) লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে ৫৫ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা “প্যালেস্টাইন অ্যাকশন”–এর সমর্থনে প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন।

‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের’ ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের ২০০০ সালের সন্ত্রাসবাদ আইন (Terrorism Act) এর ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থনে প্রকাশ্যে ব্যানার, লোগো, স্লোগান বা পোশাক প্রদর্শন অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারার আওতায় প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থনকারী যে কোনো প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড অপরাধের আওতাভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অ্যাডে অ্যাডেলেকান

তিনি বলেন, সাধারণভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে মত প্রকাশ করা অপরাধ নয়। কিন্তু প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সরাসরি সমর্থন করা, এমনকি তার লোগো, ব্যানার কিংবা স্লোগান ব্যবহার করাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে কোনো মন্তব্য বা প্ল্যাকার্ড ‘ভয়, কষ্ট বা হয়রানি’ তৈরি করছে কি না—তা পরিস্থিতিনির্ভর বিষয়।

লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার

পার্লামেন্ট স্কয়ারে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা “আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি” লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছিলেন। পুলিশ দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলে, ব্যাগ তল্লাশি করে এবং প্ল্যাকার্ড বাজেয়াপ্ত করে। বহু বিক্ষোভকারীকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়।

অন্যান্য শহরে গ্রেপ্তার

  • ম্যানচেস্টারে গ্রেপ্তার: ১৬ জন
  • ব্রিস্টলে: ১৭ জন
  • ট্রুরো ক্যাথেড্রাল, কর্নওয়াল: ৮ জন
  • গ্লাসগোতে শুক্রবার: ১ জন

ট্রুরোতে ৩০ জন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিলেও ‘অবৈধ’ প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন বন্ধ না করায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই বিক্ষোভগুলো ডিফেন্ড

আওয়ার জুরিস’ নামক একটি অধিকার সংগঠন দ্বারা সমন্বিত।

গণআন্দোলন ও সরকারি অবস্থান

গত সপ্তাহে সারাদেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৭০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়। বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলের ফিলিস্তিন গণহত্যায় সহযোগী, আর যে কেউ এই সহযোগিতার কথা বলে, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে

ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছে—

“যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় জড়িত। তারা যারা এই জড়িততা প্রকাশ করে তাদের চুপ করানোর চেষ্টা করছে।”

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

এই নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বশতাধিক আইনজীবী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার হরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁদের মতে, সরকার এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবাদ করাও শাস্তিযোগ্য হয়ে উঠেছে। একজন মন্তব্য করেন—

“শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যদি ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে গণতন্ত্র বিপন্ন।”

হাইকোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ

এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি আগামী সোমবার হাইকোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাবেন। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, এই নিষেধাজ্ঞা ইংল্যান্ডের মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী, যা মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করে।

 

যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইনপন্থী সংগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেপ্তার নিয়ে চলমান উত্তেজনা এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে: মতপ্রকাশ প্রতিবাদের অধিকার কতটা নিরাপদ? শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করা এক গভীর দমনমূলক প্রবণতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবাধিকার হরণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে—যা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক গভীর হুমকি। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন বিশ্বজুড়ে অধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের নজরকাড়া বিষয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

যুক্তরাজ্যে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ, গ্রেপ্তার শতাধিক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

Update Time : ১০:৫৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫

b8 20250720101418

আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণ
যুক্তরাজ্যে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ, গ্রেপ্তার শতাধিক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

যুক্তরাজ্য সরকার ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিক্ষোভ। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদে এখন পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুধু শনিবার (১৯ জুলাই) লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে ৫৫ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা “প্যালেস্টাইন অ্যাকশন”–এর সমর্থনে প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন।

‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের’ ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের ২০০০ সালের সন্ত্রাসবাদ আইন (Terrorism Act) এর ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থনে প্রকাশ্যে ব্যানার, লোগো, স্লোগান বা পোশাক প্রদর্শন অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারার আওতায় প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থনকারী যে কোনো প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড অপরাধের আওতাভুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অ্যাডে অ্যাডেলেকান

তিনি বলেন, সাধারণভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে মত প্রকাশ করা অপরাধ নয়। কিন্তু প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সরাসরি সমর্থন করা, এমনকি তার লোগো, ব্যানার কিংবা স্লোগান ব্যবহার করাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে কোনো মন্তব্য বা প্ল্যাকার্ড ‘ভয়, কষ্ট বা হয়রানি’ তৈরি করছে কি না—তা পরিস্থিতিনির্ভর বিষয়।

লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার

পার্লামেন্ট স্কয়ারে মহাত্মা গান্ধীর মূর্তির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা “আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি” লেখা প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করছিলেন। পুলিশ দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলে, ব্যাগ তল্লাশি করে এবং প্ল্যাকার্ড বাজেয়াপ্ত করে। বহু বিক্ষোভকারীকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়।

অন্যান্য শহরে গ্রেপ্তার

  • ম্যানচেস্টারে গ্রেপ্তার: ১৬ জন
  • ব্রিস্টলে: ১৭ জন
  • ট্রুরো ক্যাথেড্রাল, কর্নওয়াল: ৮ জন
  • গ্লাসগোতে শুক্রবার: ১ জন

ট্রুরোতে ৩০ জন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিলেও ‘অবৈধ’ প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন বন্ধ না করায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই বিক্ষোভগুলো ডিফেন্ড

আওয়ার জুরিস’ নামক একটি অধিকার সংগঠন দ্বারা সমন্বিত।

গণআন্দোলন ও সরকারি অবস্থান

গত সপ্তাহে সারাদেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৭০ জনের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়। বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলের ফিলিস্তিন গণহত্যায় সহযোগী, আর যে কেউ এই সহযোগিতার কথা বলে, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে

ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছে—

“যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় জড়িত। তারা যারা এই জড়িততা প্রকাশ করে তাদের চুপ করানোর চেষ্টা করছে।”

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

এই নিষেধাজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বশতাধিক আইনজীবী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা একে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার হরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁদের মতে, সরকার এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবাদ করাও শাস্তিযোগ্য হয়ে উঠেছে। একজন মন্তব্য করেন—

“শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ যদি ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তবে গণতন্ত্র বিপন্ন।”

হাইকোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ

এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি আগামী সোমবার হাইকোর্টে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাবেন। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, এই নিষেধাজ্ঞা ইংল্যান্ডের মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী, যা মতপ্রকাশ ও প্রতিবাদের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করে।

 

যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইনপন্থী সংগঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা ও গ্রেপ্তার নিয়ে চলমান উত্তেজনা এক গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে: মতপ্রকাশ প্রতিবাদের অধিকার কতটা নিরাপদ? শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করা এক গভীর দমনমূলক প্রবণতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানবাধিকার হরণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে—যা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এক গভীর হুমকি। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন বিশ্বজুড়ে অধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকদের নজরকাড়া বিষয়।