সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ১২৮ জন বহিষ্কার, আরও তিন শতাধিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০২:৪৪:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
  • / ১২১ Time View

ঢাবি 20250720142938

ঢাবি 20250720142938

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের ১২৮ জন নেতাকর্মীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে শাহবাগ থানায় দায়ের করা দুটি মামলার আওতায় আরও তিন শতাধিক ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

রবিবার (২০ জুলাই) সকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত এক চূড়ান্ত পরামর্শ সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হলপ্রধান, শিক্ষক প্রতিনিধি, এবং ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তদন্ত কমিটির সুপারিশেই বহিষ্কার

সভায় জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে বহিষ্কারের সুপারিশ করে। তারই ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের অন্তত ১২৮ জন নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সক্রিয় কর্মী বলে জানা গেছে।

নতুন তদন্ত কমিটি, সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে

প্রথম দফায় ২৫ জুন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মাত্র ছয়টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু ছাত্রদের মাঝে ভয়ভীতির পরিবেশ ও প্রশাসনিক নিরুত্তর মনোভাবের কারণে অভিযোগের সংখ্যা কম ছিল বলে দাবি করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। পরবর্তীতে অভিযোগ জমার সময়সীমা ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেইসঙ্গে নতুন করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আরও অভিযোগ গ্রহণ ও যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, হলভিত্তিক ছাত্রলীগ কমিটি, বিভাগীয় পর্যায়ের নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন তদন্ত কমিটি এসব সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ অভিযোগ করে আসছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের অপরাধ ঢাকতে চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক বললেও প্রশ্ন তুলছেন—বহিষ্কৃতদের মধ্যে বড় অংশই ‘কর্মী’ পর্যায়ের, অথচ মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারীরা অনেকেই অদৃশ্য।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস, তেমনি এটি ঢাবি কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ধাক্কা হতে পারে ছাত্রলীগের জন্য। বিশেষ করে, বহিষ্কৃতদের তালিকায় যদি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতারাও পড়েন, তাহলে এ নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও চাপ তৈরি হবে।

ছাত্রলীগের প্রতিক্রিয়া

এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, “বহিষ্কারের তালিকা মনগড়া ও পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত রাজনৈতিক চাপেই এসব সিদ্ধান্ত এসেছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২৮ জন ছাত্রলীগ কর্মীর বহিষ্কার এবং আরও শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়, বরং গোটা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্ররাজনীতির সংস্কৃতি ও সহিংসতা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এনে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সিদ্ধান্তগুলোকে ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সুবিচার নিশ্চিত করা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ১২৮ জন বহিষ্কার, আরও তিন শতাধিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন

Update Time : ০২:৪৪:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫

ঢাবি 20250720142938

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ছাত্রলীগের ১২৮ জন নেতাকর্মীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে শাহবাগ থানায় দায়ের করা দুটি মামলার আওতায় আরও তিন শতাধিক ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

রবিবার (২০ জুলাই) সকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজিত এক চূড়ান্ত পরামর্শ সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, হলপ্রধান, শিক্ষক প্রতিনিধি, এবং ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

তদন্ত কমিটির সুপারিশেই বহিষ্কার

সভায় জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে বহিষ্কারের সুপারিশ করে। তারই ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগের অন্তত ১২৮ জন নেতাকর্মীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও বিভাগে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও সক্রিয় কর্মী বলে জানা গেছে।

নতুন তদন্ত কমিটি, সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে

প্রথম দফায় ২৫ জুন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে মাত্র ছয়টি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু ছাত্রদের মাঝে ভয়ভীতির পরিবেশ ও প্রশাসনিক নিরুত্তর মনোভাবের কারণে অভিযোগের সংখ্যা কম ছিল বলে দাবি করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। পরবর্তীতে অভিযোগ জমার সময়সীমা ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেইসঙ্গে নতুন করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আরও অভিযোগ গ্রহণ ও যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, হলভিত্তিক ছাত্রলীগ কমিটি, বিভাগীয় পর্যায়ের নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন তদন্ত কমিটি এসব সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ অভিযোগ করে আসছিলেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের অপরাধ ঢাকতে চেষ্টা করছে। তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক বললেও প্রশ্ন তুলছেন—বহিষ্কৃতদের মধ্যে বড় অংশই ‘কর্মী’ পর্যায়ের, অথচ মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্বদানকারীরা অনেকেই অদৃশ্য।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রয়াস, তেমনি এটি ঢাবি কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ধাক্কা হতে পারে ছাত্রলীগের জন্য। বিশেষ করে, বহিষ্কৃতদের তালিকায় যদি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতারাও পড়েন, তাহলে এ নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও চাপ তৈরি হবে।

ছাত্রলীগের প্রতিক্রিয়া

এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, “বহিষ্কারের তালিকা মনগড়া ও পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত রাজনৈতিক চাপেই এসব সিদ্ধান্ত এসেছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২৮ জন ছাত্রলীগ কর্মীর বহিষ্কার এবং আরও শত শত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়, বরং গোটা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্ররাজনীতির সংস্কৃতি ও সহিংসতা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এনে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই সিদ্ধান্তগুলোকে ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের সুবিচার নিশ্চিত করা।