মৃত্যুপুরী গাজায় আবারও রক্তস্রোত: একদিনেই নিহত ৪১, মোট প্রাণহানি ছাড়াল ৫৮ হাজার ৬৬০
- Update Time : ১১:৩৬:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ জুলাই ২০২৫
- / ১৩১ Time View

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা যেন এক রক্তাক্ত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (১৮ জুলাই) দিনভর ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষণে আরও অন্তত ৪১ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১১০ জন। শুক্রবার সন্ধ্যায় গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়। তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি এ খবর নিশ্চিত করেছে।
এক নজরে প্রাণহানির ভয়াবহ পরিসংখ্যান
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)। সেই থেকে এখন পর্যন্ত—২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত—ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৫৮ হাজার ৬৬৭ জন ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৪ জন।
এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি জনগোষ্ঠীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার, তাদের ঘরবাড়ি, পরিবার, শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নীরব করুণ দলিল।
হামাস হামলা থেকে গাজা ধ্বংস পর্যন্ত
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন হামাস হঠাৎ করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একটি সমন্বিত হামলা চালায়। এতে প্রায় ১,২০০ জন ইসরায়েলি নাগরিক নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল জিম্মিদের উদ্ধার ও হামাসের শক্তি ভেঙে ফেলা।
যুদ্ধবিরতির ছল, ফের হামলার ঝড়
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রের চাপের মুখে ইসরায়েল গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। তবে মাত্র দুই মাসের মাথায়, ১৮ মার্চ থেকে ফের নতুন করে হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী।
এই দ্বিতীয় দফার অভিযানে মাত্র আড়াই মাসেই ৭,৮৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার ৯৯৩ জন।
জিম্মি উদ্ধার নাকি গণহত্যা?
ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করছে, তারা এখনো ধারণা করছে হামাসের হাতে ৩৫ জন জিম্মি জীবিত আছেন। এইসব জিম্মিদের উদ্ধারের লক্ষ্যে তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অভিযান এখন আর কেবল জিম্মি উদ্ধারে সীমাবদ্ধ নেই—এটি এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও নেতানিয়াহুর একরোখা অবস্থান
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছে।
তবে এসব আহ্বানকে উপেক্ষা করে নেতানিয়াহু এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—
“হামাসকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা এবং জিম্মিদের মুক্ত না করা পর্যন্ত আমাদের অভিযান চলবে।”
গাজার মানুষের জীবন: মৃত্যু, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তা
বর্তমানে গাজা উপত্যকার প্রায় প্রতিটি পরিবার শোকাহত, বাস্তুচ্যুত কিংবা আহত। হাসপাতালগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত, খাদ্য ও পানির সংকট তীব্র, বিদ্যুৎ ও ওষুধের ঘাটতি মারাত্মক। মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে না পারায় হাজার হাজার শিশু অনাহারে বা চিকিৎসাহীনতায় মৃত্যুর মুখে।
বিশ্ববিবেকের নীরবতা?
ইসরায়েলের লাগাতার হামলার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের জোয়ার থাকলেও কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা মিত্ররা একদিকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও অপরদিকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
গাজার আকাশে এখনো বারুদের গন্ধ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে শত শত জীবন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন উঠছে—এই গণহত্যা আর কতদিন চলবে? আর কত মৃত্যু হলে বিশ্ববিবেক জাগবে?
এটি কেবল একটি ভূখণ্ডের নয়—মানবতার অস্তিত্বের প্রশ্ন।













