ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ক্ষমার সম্ভাবনা নাকচ করলো নিহতের পরিবার
- Update Time : ০৮:০৭:৪২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ জুলাই ২০২৫
- / ১৬৩ Time View

ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ক্ষমার সম্ভাবনা নাকচ করলো নিহতের পরিবার
প্রতিবেদন: বিবিসি বাংলা অবলম্বনে বিস্তৃত বিশ্লেষণ
ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়া ইয়েমেনের নাগরিক ও তার সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার তালাল আব্দো মাহদিকে হত্যার দায়ে যে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, সেই রায় মাফ করার ব্যাপারে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখাতে রাজি নয় নিহতের পরিবার। মাহদির ভাই আব্দেলফাতাহ্ মাহদি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “আমরা কেবলমাত্র ইসলামের ন্যায়বিচারের নিয়ম ‘কিসাস’ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডই চাই। এর বাইরে কোনো রকম সমঝোতা, ক্ষমা বা রক্তমূল্য গ্রহণ আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।”
নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড আপাতত স্থগিত, কিন্তু অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে
ইয়েমেন কর্তৃপক্ষ নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়সীমা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। যদিও এটি নিছক আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এ স্থগিতাদেশের কারণে আপাতত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে না, কিন্তু নিহতের পরিবার তাদের অবস্থান একটুও বদলায়নি।
আব্দেলফাতাহ্ মাহদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং আরবি সংবাদমাধ্যম ‘আল-কুদ্স’-এ দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার জানিয়েছেন, “আমরা আদালতের রায়ে বিশ্বাস করি এবং কিসাস কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে। আমরা কোনও চাপের কাছে মাথানত করব না।”
‘রক্ত নিয়ে ব্যবসা নয়’, বলছে নিহতের পরিবার
তালাল মাহদির পরিবারকে ভারতের তরফ থেকে এক মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তমূল্য দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা নিমিশার পরিবার ও তার সমর্থকরা বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু মাহদি পরিবার এটি গ্রহণে একেবারেই অনিচ্ছুক।
আব্দেলফাতাহ্ মাহদির ভাষায়, “রক্তের মূল্য হয় না। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে আরেকজনকে হত্যা করে, এবং তারপর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তবে সেটাই হবে প্রকৃত অন্যায়ের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।”
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
মাহদি পরিবার ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো নিমিশা প্রিয়াকে পরিস্থিতির শিকার হিসেবে তুলে ধরে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
‘কিসাস’ কী এবং এর ইসলামিক ব্যাখ্যা
‘কিসাস’ (Qisas) হলো ইসলামি শরিয়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দণ্ডবিধি, যার অর্থ ‘প্রতিশোধ’ বা ‘প্রতিদান’। এ নীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে “প্রাণের বদলে প্রাণ” এবং এটি কুরআনে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে।
মুফতি ওসামা নদভি বিবিসি হিন্দিকে বলেন, “যে অপরাধ করেছে তাকে একই মাত্রার শাস্তি দিতে হবে। নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এ নীতি কার্যকর হয়।”
তবে তিনি এটাও বলেন, “কোনো নারী যদি শিশু সন্তানকে দুধ পান করান, তাহলে শিশুটি একটু বড় না হওয়া পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখা হয়।” অর্থাৎ শরিয়া আইনের পাশাপাশি মানবিক বিবেচনার ব্যবস্থাও কিছুটা রয়েছে।
ভারত সরকারের উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা
ভারত সরকার এই ঘটনাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, “ভারতীয় দূতাবাস নিয়মিতভাবে ইয়েমেনের হুথি প্রশাসন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পরিবারকে আইনগত সহায়তা, একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী, ও নিয়মিত কূটনৈতিক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
তবে বাস্তবতা হলো, ইয়েমেনে ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব খুব একটা শক্তিশালী নয়, বিশেষ করে হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত সানা-তে। এ কারণে বিষয়টি সমাধানে ভারতকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট: প্রেম, প্রতারণা, ও প্রাণনাশ
২০০৮ সালে কেরালার বাসিন্দা নার্স নিমিশা প্রিয়া একটি সরকারি হাসপাতালে কাজ করতে ইয়েমেনে যান। সেখানে তার সঙ্গে তালাল মাহদির পরিচয় হয় এবং পরে তারা একটি ব্যবসার অংশীদার হন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।
২০১৭ সালে মাহদির দেহ টুকরো অবস্থায় একটি পানির ট্যাংকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ উঠে, নিমিশা মাহদিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে হত্যা করেন এবং পরে দেহ টুকরো করে লুকিয়ে রাখেন।
তার আইনজীবীরা দাবি করেন, নিমিশা শুধু নিজের পাসপোর্ট উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন—হত্যা উদ্দেশ্য ছিল না। তবে আদালত তার যুক্তি মানেনি।
চূড়ান্ত রায়: মৃত্যুদণ্ড বহাল
২০২০ সালে ইয়েমেনের আদালত নিমিশাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০২৩ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্টও এই রায় বহাল রাখে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হুথিদের শীর্ষ নেতা মাহদি আল-মাশাত আনুষ্ঠানিকভাবে রায় অনুমোদন করেন।
প্রাণ বাঁচাতে সংগ্রাম: পরিবার ও সহমর্মী সংগঠনের লড়াই
নিমিশার মা, যিনি কেরালায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন, গত কয়েক বছর ধরে মেয়ের পাশে থাকতে ইয়েমেনেই অবস্থান করছেন।
তার সহায়তায় গঠিত হয়েছে ‘সেইভ নিমিশা প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন কাউন্সিল’, যারা দেশ-বিদেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে ব্লাড মানির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
কিন্তু এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবার অনড়—ক্ষমা নয়, কেবল কিসাস।
নিমিশা প্রিয়া কেসটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী অধিকার, শরিয়া আইন, কূটনীতি এবং ন্যায়বিচারের মধ্যে এক জটিল ও গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভারতের জন্য এটি শুধু এক নারীর জীবন রক্ষার লড়াই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কূটনৈতিক সক্ষমতারও এক বাস্তব পরীক্ষা।
অন্যদিকে, মাহদি পরিবার তাদের অবস্থানে কঠোরভাবে অনড় রয়েছে এবং কিসাস বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছু তারা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
এই পরিস্থিতিতে, নিমিশা প্রিয়ার জীবন বাঁচানো ভারত ও তার সমর্থকদের জন্য হয়ে উঠছে এক কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ চ্যালেঞ্জ।














