ব্রিটিশ গণমাধ্যমে মুসলিম নারীদের প্রতি বৈষম্য: নতুন জরিপে উঠে এলো উদ্বেগজনক বাস্তবতা
- Update Time : ১১:০৪:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
- / ১৪৮ Time View

লন্ডন থেকে প্রকাশিত সিএফএমএম–এর জরিপ তুলে ধরছে গাজার যুদ্ধ, ইসলামোফোবিয়া ও পেশাগত বৈষম্যের চিত্র
ব্রিটেনের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত বৈষম্য ও কাঠামোগত বর্জনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে এক নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে। লন্ডনে অবস্থিত “সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং” (CFMM) সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ‘মিডিয়ায় মুসলিম নারী: ব্রেকিং ব্যারিয়ারস, বিয়ারিং দ্য বার্ডেন’ শিরোনামের এক বিশ্লেষণধর্মী জরিপভিত্তিক প্রতিবেদন, যা ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ১০২ জন মুসলিম নারীর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি।
প্রতিবেদনটি বলছে, ইসলামোফোবিয়া, স্টেরিওটাইপিং, এবং প্রতীকীবাদ এই নারীদের পেশাগত বিকাশে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। বহু নারী জানিয়েছেন, তারা তাদের পেশাগত জীবন নিয়ে এখন চরম হতাশায় ভুগছেন, এমনকি সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন।
মুসলিম নারী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা: ভয়, লজ্জা ও বঞ্চনার চক্র
জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের ৯২ শতাংশ বলেছেন, গণমাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রতিষ্ঠিত। ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, মুসলিম পরিচয়ের কারণেই তাদের সরাসরি বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
গাজার উপর ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং তার কভারেজ নিয়ে বিশেষভাবে মানসিক চাপে পড়েছেন তারা। ৮৫ শতাংশ বলেছেন, এই কভারেজ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। এক জন নারী সাংবাদিক বলেন, “আমি নিজেকে সাংবাদিক বলতে এতটা লজ্জিত কখনো হইনি।“
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৬০ শতাংশ সাংবাদিকই ভাবছেন তারা এই পেশা ছেড়ে দেবেন।
‘মুসলিম গল্পে’ আটকে থাকা, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত থেকে বাদ পড়া
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মুসলিম নারী সাংবাদিকরা প্রায়ই শুধুমাত্র ধর্মভিত্তিক বা ‘মুসলিম ইস্যু’ ঘিরে প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। ফলে, মূলধারার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে।
অনেকে বলেছেন, তারা সম্পাদকীয় আলোচনায় অংশ নিতে পারেন না। এমনকি যারা উচ্চপদে রয়েছেন, তারাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত। একজন উত্তরদাতা বিষয়টি বর্ণনা করেছেন “নীরবতার
নেসরিন মালিকের সতর্ক বার্তা
গার্ডিয়ানের খ্যাতনামা কলাম লেখক নেসরিন মালিক এই প্রসঙ্গে বলেন, “গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক আবহ মুসলিমদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামোফোবিয়ার মধ্যে কাজ করেন, তখন আপনি অনেক কিছুকেই স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেন—এটা যেমন বিষাক্ত, তেমনি ধ্বংসাত্মক।”
বৈচিত্র্য থাকলেও প্রকৃত অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যমে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ কিছুটা বেড়েছে, তথাপি তারা এখনও নিজেদের “প্রতীকী উপস্থিতি” বলেই মনে করছেন।
৮১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, মিডিয়া কনটেন্টে মুসলিম নারীরা এখনও ন্যায্যভাবে উপস্থাপিত হচ্ছেন না। ৩৫ শতাংশ নারী বলেছেন, তারা তাদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে চরম বাধার সম্মুখীন।
মানবিক সংকট এবং সাংবাদিকদের মনের যুদ্ধ
গাজার যুদ্ধের সংবাদ কাভারেজ যেন মুসলিম সাংবাদিকদের জন্য এক মানসিক যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা একদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে তাদের ধর্মীয়, জাতিগত এবং মানবিক বোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অনেকেই জানিয়েছেন, তারা গাজার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তা সম্পাদকদের দ্বারা উপেক্ষিত হয়েছে। এ বিষয়ে একজন সাংবাদিক বলেছেন, “আমাদের কথা যেন দেয়ালে ছুঁড়ে মারা হয়েছে। আমরা আমাদের বিবেক নিয়ে লড়ছি, অথচ আমাদের চুপ করে যেতে বলা হচ্ছে।“
সিএফএমএম-এর এই প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উন্মোচন করেছে, যা কেবল ব্রিটেনের গণমাধ্যম জগতেই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ও কর্মক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যের প্রতিফলন।
এই সমস্যা সমাধানে কেবল বৈচিত্র্যের ওপর জোর দিলেই চলবে না, বরং সাংবাদিকতার নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার, সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং ইসলামোফোবিয়া দূরীকরণে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।
সূত্র: দ্য নিউ আরব, CFMM Report 2024.













