নৌকা প্রতীক পুনরায় শিডিউলভুক্ত করার উদ্যোগে বিস্ময়: নির্বাচন কমিশনের প্রতি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের জিজ্ঞাসা
- Update Time : ০৬:৪০:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
- / ১৭৫ Time View

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতীক ‘নৌকা’ পুনরায় শিডিউলভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে কেন্দ্র করে। এই বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকারবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন—‘কার স্বার্থে এবং কোন যুক্তিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত প্রতীকটিকে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হলো?’
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ লিখেছেন,
“অভিশপ্ত ‘নৌকা’ মার্কাটাকে আপনারা কোন বিবেচনায় আবার শিডিউলভুক্ত করতে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেন? সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই গণ–অভ্যুত্থানকে আপনারা জাস্ট বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন। কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এবং কাদের দেওয়ার জন্য এই মার্কা রাখছেন আপনারা? পরাজিতদের স্বপ্নের রিফাইন্ড আওয়ামিলীগকে তাদের মার্কা ফিরিয়ে দিতে চান? বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে নির্বাচন কমিশনের প্রতি প্রশ্ন রইল।”
পটভূমি
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১২ মে একটি গেজেট জারির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’কে আবারও নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে শিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে সেই প্রশ্নের প্রতিধ্বনি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
জনমনে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ‘নৌকা’ প্রতীকের শিডিউলভুক্তিকরণ জনমনে সংশয় সৃষ্টি করেছে যে, হয়তো সরকার পতনের পরও পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো আবারও ফিরে আসার পথ তৈরি করছে।
এ প্রসঙ্গে এক নাগরিক অধিকার আন্দোলন কর্মী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ রাস্তায় নেমেছিল, প্রাণ দিয়েছে। এখন যদি সেই সরকারের প্রতীককে আবার বৈধতা দেওয়া হয়, তবে সেটা গণআন্দোলনের অপমানের শামিল।”
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যদি তারা রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার প্রভাব পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল হাসান বলেন, “যে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং যার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধসহ নানাবিধ অভিযোগ বিচারাধীন, তাদের প্রতীক পুনরায় শিডিউলভুক্ত করা আইনি ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”
ভবিষ্যৎ প্রভাব
আসন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন সিদ্ধান্ত দেশের রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। যদি জনগণ বিশ্বাস করে, পুরনো ও অভিযুক্ত শক্তিগুলো পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন এখন একটি নাজুক অবস্থানে রয়েছে। তাদেরকে অবশ্যই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে—কোন আইনানুগ ভিত্তিতে এবং কী জনস্বার্থে ‘নৌকা’ প্রতীককে পুনরায় তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অন্যথায়, জনগণের মনে এই বার্তাই স্পষ্ট হবে—প্রতীক বদলায়, কিন্তু পুরনো ক্ষমতার ছায়া ত্যাগ করে না।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা যেন আরেকটি প্রতীকের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি থাকা জরুরি।













