সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

থাইল্যান্ডে ভিক্ষুদের যৌন ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল: নারী গ্রেপ্তার, উদ্ধার ৮০ হাজার ছবি-ভিডিও, ৩ বছরে আয় প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:৩২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
  • / ১৬৫ Time View

1752665368 61d221bcbc1911ee07d647933ed65d0d

1752665368 61d221bcbc1911ee07d647933ed65d0d

থাইল্যান্ডের সমাজ ও ধর্মীয় কাঠামোতে গভীর আলোড়ন তুলেছে এক নারীর কেলেঙ্কারি—যিনি অন্তত ৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন বছর ধরে এভাবে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে নৈতিকতা, ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও সন্ন্যাসজীবনের পবিত্রতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ব্ল্যাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা আদায়

থাইল্যান্ডের পুলিশ জানায়, ‘গলফ’ নামের এক নারী দীর্ঘ সময় ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলে তা ভিডিও করে রাখতেন। এরপর সেই ভিডিও ও ছবিগুলো ব্যবহার করে অর্থ আদায় করতেন। পুলিশ ধারণা করছে, তিনি এভাবে অন্তত ৩৮৫ মিলিয়ন থাই বাত অর্থাৎ প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়) আদায় করেছেন।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মুখপাত্র জানান, গলফের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮০ হাজারেরও বেশি ছবি ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে, যা ভিক্ষুদের হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহৃত হতো।

ঘটনা নজরে আসে এক ভিক্ষুর পলায়নের পর

বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে ২০২৪ সালের জুন মাসে। ব্যাংককের এক ভিক্ষু আচমকা ভিক্ষুত্ব ছেড়ে চলে যান। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, তিনি ওই নারীর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছিলেন। ভিক্ষু জানায়, ২০২৪ সালের মে মাসে গলফের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে নারীটি দাবি করেন, তিনি গর্ভবতী এবং সন্তানের ভরণপোষণ বাবদ ৭০ লাখ থাই বাত দাবি করেন।

এ ঘটনার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু হলে পুলিশ জানতে পারে, আরও বেশ কয়েকজন ভিক্ষুও একই কায়দায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ গলফের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়েছে।

অর্থপাচার অনলাইন জুয়ার সম্পর্ক

তদন্তে উঠে এসেছে, ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ অনলাইন

জুয়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে। পুলিশের কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গলফ শুধুমাত্র ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে নয়—অর্থপাচার, চাঁদাবাজি চুরি করা সম্পদ গ্রহণের অভিযোগে বর্তমানে অভিযুক্ত।

ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

থাই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে এই ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। থাইল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি বৌদ্ধ এবং ভিক্ষুদের সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। শুধু ধর্মীয় চর্চার অংশ হিসেবে নয়, থাই সমাজে বহু পুরুষ জীবনের কিছু সময় ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করে ‘সৎকর্ম’ অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের একের পর এক কেলেঙ্কারি ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও জনবিশ্বাসকে ধ্বংস করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট বৌদ্ধ নেতারা।

সরকার সংঘের কঠোর পদক্ষেপ

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘ সুপ্রিম কাউন্সিল (থাই বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ) ঘোষণা দিয়েছে, তারা সন্ন্যাসী আচরণবিধি শুদ্ধাচার বিধিমালা পর্যালোচনায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করবে। থাই সরকারও ভিক্ষুদের জন্য কঠোর আইন শাস্তির বিধান—যেমন জেল ও আর্থিক জরিমানা—আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে।

রাজকীয় প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক দুর্নীতি ও অসদাচরণের ঘটনায় থাইল্যান্ডের রাজা ভাজিরালংকর্ন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জুন মাসে ৮১ জন ভিক্ষুকে উচ্চতর ধর্মীয় উপাধি প্রদানের জন্য জারি করা একটি রাজকীয় আদেশ প্রত্যাহার করেছেন। রাজা বলেছেন, “এই ধরনের ঘটনাগুলো ভিক্ষুদের প্রতি জনগণের আস্থা ধ্বংস করছে এবং বৌদ্ধদের হৃদয়ে গভীর কষ্ট দিয়েছে।”

পুলিশ হটলাইন জনসচেতনতা

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ভিক্ষু বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে বা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ হটলাইন চালু করা হয়েছে। জনগণকে সচেতন থেকে এই ধরনের অপরাধ রোধে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

এই ঘটনা শুধু থাইল্যান্ডের ধর্মীয় মহলে নয়, সমগ্র সমাজব্যবস্থার নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। একদিকে ভিক্ষুদের অসততা ও দুর্বলতা, অন্যদিকে অপরাধী নারীর কৌশলী ব্ল্যাকমেইল—এই দুই মিলেই সমাজে এক ভয়াবহ বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ধর্ম, নৈতিকতা ও আইন—তিনটিরই সংস্কার প্রয়োজন যেন ভবিষ্যতে এমন চরম অপমান ও অপব্যবহার আর না ঘটে।

এটি শুধু থাইল্যান্ড নয়, বিশ্বের অন্যান্য সমাজেও এক সতর্কবার্তা—যেখানে ধর্মীয় নেতারাও যদি বিপথগামী হন, তবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

থাইল্যান্ডে ভিক্ষুদের যৌন ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইল: নারী গ্রেপ্তার, উদ্ধার ৮০ হাজার ছবি-ভিডিও, ৩ বছরে আয় প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা

Update Time : ০৬:৩২:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫

1752665368 61d221bcbc1911ee07d647933ed65d0d

থাইল্যান্ডের সমাজ ও ধর্মীয় কাঠামোতে গভীর আলোড়ন তুলেছে এক নারীর কেলেঙ্কারি—যিনি অন্তত ৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে গোপনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিন বছর ধরে এভাবে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে নৈতিকতা, ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও সন্ন্যাসজীবনের পবিত্রতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ব্ল্যাকমেইল করে কোটি কোটি টাকা আদায়

থাইল্যান্ডের পুলিশ জানায়, ‘গলফ’ নামের এক নারী দীর্ঘ সময় ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলে তা ভিডিও করে রাখতেন। এরপর সেই ভিডিও ও ছবিগুলো ব্যবহার করে অর্থ আদায় করতেন। পুলিশ ধারণা করছে, তিনি এভাবে অন্তত ৩৮৫ মিলিয়ন থাই বাত অর্থাৎ প্রায় ১৪৪ কোটি টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়) আদায় করেছেন।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মুখপাত্র জানান, গলফের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৮০ হাজারেরও বেশি ছবি ভিডিও উদ্ধার করা হয়েছে, যা ভিক্ষুদের হুমকি ও ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহৃত হতো।

ঘটনা নজরে আসে এক ভিক্ষুর পলায়নের পর

বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে ২০২৪ সালের জুন মাসে। ব্যাংককের এক ভিক্ষু আচমকা ভিক্ষুত্ব ছেড়ে চলে যান। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, তিনি ওই নারীর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছিলেন। ভিক্ষু জানায়, ২০২৪ সালের মে মাসে গলফের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে নারীটি দাবি করেন, তিনি গর্ভবতী এবং সন্তানের ভরণপোষণ বাবদ ৭০ লাখ থাই বাত দাবি করেন।

এ ঘটনার সূত্র ধরে তদন্ত শুরু হলে পুলিশ জানতে পারে, আরও বেশ কয়েকজন ভিক্ষুও একই কায়দায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন এবং তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ গলফের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়েছে।

অর্থপাচার অনলাইন জুয়ার সম্পর্ক

তদন্তে উঠে এসেছে, ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ অনলাইন

জুয়ার পেছনে ব্যয় হয়েছে। পুলিশের কাছে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গলফ শুধুমাত্র ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে নয়—অর্থপাচার, চাঁদাবাজি চুরি করা সম্পদ গ্রহণের অভিযোগে বর্তমানে অভিযুক্ত।

ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

থাই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে এই ঘটনার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। থাইল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি বৌদ্ধ এবং ভিক্ষুদের সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। শুধু ধর্মীয় চর্চার অংশ হিসেবে নয়, থাই সমাজে বহু পুরুষ জীবনের কিছু সময় ভিক্ষুত্ব গ্রহণ করে ‘সৎকর্ম’ অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের একের পর এক কেলেঙ্কারি ধর্মীয় শৃঙ্খলা ও জনবিশ্বাসকে ধ্বংস করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট বৌদ্ধ নেতারা।

সরকার সংঘের কঠোর পদক্ষেপ

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংঘ সুপ্রিম কাউন্সিল (থাই বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ) ঘোষণা দিয়েছে, তারা সন্ন্যাসী আচরণবিধি শুদ্ধাচার বিধিমালা পর্যালোচনায় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করবে। থাই সরকারও ভিক্ষুদের জন্য কঠোর আইন শাস্তির বিধান—যেমন জেল ও আর্থিক জরিমানা—আরোপের উদ্যোগ নিচ্ছে।

রাজকীয় প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক দুর্নীতি ও অসদাচরণের ঘটনায় থাইল্যান্ডের রাজা ভাজিরালংকর্ন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জুন মাসে ৮১ জন ভিক্ষুকে উচ্চতর ধর্মীয় উপাধি প্রদানের জন্য জারি করা একটি রাজকীয় আদেশ প্রত্যাহার করেছেন। রাজা বলেছেন, “এই ধরনের ঘটনাগুলো ভিক্ষুদের প্রতি জনগণের আস্থা ধ্বংস করছে এবং বৌদ্ধদের হৃদয়ে গভীর কষ্ট দিয়েছে।”

পুলিশ হটলাইন জনসচেতনতা

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, ভিক্ষু বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে বা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ হটলাইন চালু করা হয়েছে। জনগণকে সচেতন থেকে এই ধরনের অপরাধ রোধে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

এই ঘটনা শুধু থাইল্যান্ডের ধর্মীয় মহলে নয়, সমগ্র সমাজব্যবস্থার নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। একদিকে ভিক্ষুদের অসততা ও দুর্বলতা, অন্যদিকে অপরাধী নারীর কৌশলী ব্ল্যাকমেইল—এই দুই মিলেই সমাজে এক ভয়াবহ বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ধর্ম, নৈতিকতা ও আইন—তিনটিরই সংস্কার প্রয়োজন যেন ভবিষ্যতে এমন চরম অপমান ও অপব্যবহার আর না ঘটে।

এটি শুধু থাইল্যান্ড নয়, বিশ্বের অন্যান্য সমাজেও এক সতর্কবার্তা—যেখানে ধর্মীয় নেতারাও যদি বিপথগামী হন, তবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।