গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণ ও হামলা: ছাত্রলীগকে দায়, পুলিশের গাড়িতে আগুন, ইউএনও’র বহরে ভাঙচুর
- Update Time : ০২:৪৮:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
- / ১৯১ Time View

গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণ ও হামলা: ছাত্রলীগকে দায়, পুলিশের গাড়িতে আগুন, ইউএনও’র বহরে ভাঙচুর
রাজনৈতিক উত্তেজনায় রণক্ষেত্র গোপালগঞ্জ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ঘোষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৬ জুলাই) দুপুরে শহরের পৌর পার্ক এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। একইদিন সকালে সদর উপজেলার উলপুর-দুর্গাপুর সড়কে পুলিশের গাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িবহরে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
সার্বিক ঘটনায় এনসিপি নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করে স্লোগান দেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ত ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণ ও চেয়ার ভাঙচুর
প্রত্যক্ষদর্শী ও এনসিপির নেতাকর্মীরা জানান, সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা পৌর পার্ক এলাকায় জমায়েত হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ঠিক তখনই কয়েকজন যুবক সমাবেশস্থলে প্রবেশ করে আচমকাই হামলা চালায়।
তারা মঞ্চ লক্ষ্য করে ককটেল ছোঁড়ে, যার বিকট শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি বেশ কিছু চেয়ার ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয় এবং ভাঙচুর চালানো হয়।
এ ঘটনার জন্য ছাত্রলীগকে সরাসরি দায়ী করেন এনসিপির কর্মীরা। তারা ঘটনার পরপরই “ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও” স্লোগানে সমাবেশস্থল মুখরিত করেন।
একজন এনসিপি নেতা বলেন,
“আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের মঞ্চে ককটেল ছুঁড়ে হামলা চালিয়েছে। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে, কোনো প্রতিরোধ করেনি।”
এ সময় এনসিপির কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“পুলিশ যদি নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে আমাদের জানিয়ে দিক। আমরা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।”

পুলিশের গাড়িতে হামলা ও আগুন
এর আগে বুধবার সকালেই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাটিয়াগড় চরপাড়ায় পুলিশের একটি গাড়িতে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, জাতীয় নাগরিক পার্টির কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষের আশঙ্কায় পুলিশ সেখানে অবস্থান করছিল। এমন সময় একদল যুবক পুলিশের গাড়িতে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, ভাঙচুর চালায় এবং একপর্যায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এই হামলায় পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। তারা হলেন:
- গোপীনাথপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) আহমেদ বিশ্বাস
- কনস্টেবল কাওছার
- কনস্টেবল মিনহাজ
আহতদের গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, এক যুবক পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করছে। পেছনে লাঠি হাতে আরও কয়েকজন যুবক চিৎকার করে বলছে,
“আমরা এখনও রাজপথে আছি। এই গাড়ি ভেঙে ফেল, আগুন ধরা!”
ইউএনও’র গাড়িবহরেও হামলা
পুলিশের গাড়ির ওপর হামলার কিছুক্ষণ পরই সদর উপজেলার গান্ধিয়াশুর এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম রকিবুল হাসানের গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় ইউএনও’র গাড়িচালক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইউএনও এম রকিবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন,
“এনসিপির ঘোষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ কেন্দ্রীয় নেতারা গোপালগঞ্জে আসছিলেন। তাদের র্যালি বানচাল করতে কিছু ব্যক্তি আমাদের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারী আহত হয়েছেন এবং গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও পটভূমি
এনসিপি গত ১ জুলাই থেকে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ শিরোনামে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু করে। ইতোমধ্যে দলটি কয়েকটি জেলায় র্যালি ও সমাবেশ করেছে। গোপালগঞ্জ ছিল মাসব্যাপী কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
তবে গোপালগঞ্জে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে এনসিপির এই মুখোমুখি অবস্থান নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন,
“সরকার নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে হামলা চালাচ্ছে। ছাত্রলীগকে দিয়ে পরিবেশ নষ্ট করছে। এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং সরকারের দমননীতিরই বহিঃপ্রকাশ।”
গোপালগঞ্জে একদিনে পুলিশের গাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ইউএনও’র বহরে ভাঙচুর এবং বিরোধী দলের মঞ্চে ককটেল হামলা দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, অবিলম্বে তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে—যাতে দেশ আবার সহিংসতার দিকে না যায়।













