সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজায় কবরের জায়গা নেই: এক অব্যাহত গণকবরে পরিণত হচ্ছে উপত্যকাটি

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৭:০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
  • / ১৫৫ Time View

a7d38e0 68768965aba6f

a7d38e0 68768965aba6f
 

টানা ২২ মাসেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যু যেন গাজা উপত্যকার প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিন নতুন করে যোগ হচ্ছে নিহতের তালিকায় শত শত ফিলিস্তিনি নাগরিকের নাম। হাসপাতালের করিডর, স্কুলের বারান্দা, রাস্তাঘাট, এমনকি ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে হাজারো লাশ। এই ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে আজ গাজার সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা—কবর দেওয়ার জায়গাও আর নেই।

মৃত্যুর ছায়ায় গাজা: প্রতিদিনই নতুন সংখ্যা

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৫৮ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও এক লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। শুধু তাই নয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রায় ১০ হাজার মানুষ চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাস্তবতা আরও ভয়াবহ: স্বাধীন গবেষণার পরিসংখ্যানে চমকে ওঠা তথ্য

এর আগে ৬ জুলাই মেড-আর্কাইভ এবং প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের এক যৌথ জরিপে বলা হয়, গত ১৫ মাসে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। জরিপ অনুযায়ী, ৭৫ হাজার ২০০ জন সরাসরি বোমা হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন, আর ৮ হাজার ৫৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন অনাহারে।

এই জরিপটি সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। কারণ, সরকার কেবল সেই নিহতদের তালিকাভুক্ত করে যাদের লাশ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায়। অথচ বাস্তবতায় বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করছেন, যাদের খোঁজ বা পরিসংখ্যান কেউ রাখছে না।

কোথাও আর ঠাঁই নেইকবরস্থানে চলছে সংকট

লাশের সংখ্যায় এমন বিস্ফোরণ ঘটায় গাজার কবরস্থানগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সংকট। পুরোনো কবর খুঁড়ে নতুন লাশ দাফনের মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন শোকাহত পরিবারগুলো। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাড়ির উঠোনেই স্বজনদের সমাহিত করছেন। জনমানবশূন্য রাস্তাঘাট বা ধ্বংসস্তূপের পাশেও দাফনের নজির পাওয়া যাচ্ছে, যা গাজার মানবিক বিপর্যয়ের করুণ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, বহু ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র থামিন আল-খেতান জানান, শুধুমাত্র ত্রাণ সংগ্রহের সময় ইসরাইলি হামলায় ৮৭৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এমনকি পানি বিতরণ কেন্দ্রেও চলছে বর্বর হামলা—যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৭০০ জনের বেশি মানুষের। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মানবিক সহায়তার প্রতিটি পথ যেন মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠেছে।

শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার অভাবে বর্তমানে প্রতি ১০ জন শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে। দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি হতে পারে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস।

নতুন করে উচ্ছেদের হুমকি

গাজা উপত্যকার উত্তরের অন্তত ১৬টি এলাকা নতুন করে উচ্ছেদের হুমকির মুখে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র ঘোষণা দিয়েছেন, গাজা শহর ও জাবালিয়ার নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাওয়াসির অঞ্চলে সরিয়ে যেতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ—ফের নতুন করে গৃহচ্যুতি, অসহায়ত্ব এবং মৃত্যু।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ: আলোচনার টেবিলে মানবতা

এদিকে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে সমাধান খুঁজতে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণে একটি কূটনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সম্মেলনে যুদ্ধ বন্ধ, আইনি পদক্ষেপ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিতে আলোচনা চলছে।

গাজা উপত্যকা আজ এক চলমান গণকবরে পরিণত হয়েছে। যেখানে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু যেন বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কবর দেওয়ার জায়গা নেই, ত্রাণ নিতে গেলে বোমা পড়ে, এবং যাদের দাফন হয়, তাদের স্মরণ করবারও সময় নেই স্বজনদের। এই বাস্তবতায় বিশ্ব বিবেক কতদিন নীরব থাকবে? মানবতার পক্ষেই কি এখন কিছু করার সময় হয়নি?

গাজার আকাশে আজো বোমা বর্ষণ হয়, কিন্তু তাতে কেউ চমকে ওঠে না। কারণ সেখানে এখন চমকের কিছু নেই—আছে শুধু নিরব কান্না, মৃত্যু আর অপার মানবিক বিপর্যয়।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গাজায় কবরের জায়গা নেই: এক অব্যাহত গণকবরে পরিণত হচ্ছে উপত্যকাটি

Update Time : ০৭:০৪:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ জুলাই ২০২৫
a7d38e0 68768965aba6f
 

টানা ২২ মাসেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যু যেন গাজা উপত্যকার প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিন নতুন করে যোগ হচ্ছে নিহতের তালিকায় শত শত ফিলিস্তিনি নাগরিকের নাম। হাসপাতালের করিডর, স্কুলের বারান্দা, রাস্তাঘাট, এমনকি ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে আছে হাজারো লাশ। এই ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে আজ গাজার সবচেয়ে করুণ বাস্তবতা—কবর দেওয়ার জায়গাও আর নেই।

মৃত্যুর ছায়ায় গাজা: প্রতিদিনই নতুন সংখ্যা

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরাইলি আগ্রাসনের পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৫৮ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরও এক লাখ ৩৯ হাজারের বেশি। শুধু তাই নয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রায় ১০ হাজার মানুষ চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাস্তবতা আরও ভয়াবহ: স্বাধীন গবেষণার পরিসংখ্যানে চমকে ওঠা তথ্য

এর আগে ৬ জুলাই মেড-আর্কাইভ এবং প্যালেস্টাইন সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের এক যৌথ জরিপে বলা হয়, গত ১৫ মাসে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। জরিপ অনুযায়ী, ৭৫ হাজার ২০০ জন সরাসরি বোমা হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন, আর ৮ হাজার ৫৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন অনাহারে।

এই জরিপটি সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তুলনায় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। কারণ, সরকার কেবল সেই নিহতদের তালিকাভুক্ত করে যাদের লাশ হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায়। অথচ বাস্তবতায় বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করছেন, যাদের খোঁজ বা পরিসংখ্যান কেউ রাখছে না।

কোথাও আর ঠাঁই নেইকবরস্থানে চলছে সংকট

লাশের সংখ্যায় এমন বিস্ফোরণ ঘটায় গাজার কবরস্থানগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র সংকট। পুরোনো কবর খুঁড়ে নতুন লাশ দাফনের মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন শোকাহত পরিবারগুলো। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাড়ির উঠোনেই স্বজনদের সমাহিত করছেন। জনমানবশূন্য রাস্তাঘাট বা ধ্বংসস্তূপের পাশেও দাফনের নজির পাওয়া যাচ্ছে, যা গাজার মানবিক বিপর্যয়ের করুণ প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, বহু ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। জাতিসংঘের মুখপাত্র থামিন আল-খেতান জানান, শুধুমাত্র ত্রাণ সংগ্রহের সময় ইসরাইলি হামলায় ৮৭৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এমনকি পানি বিতরণ কেন্দ্রেও চলছে বর্বর হামলা—যেখানে মৃত্যু হয়েছে ৭০০ জনের বেশি মানুষের। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই মানবিক সহায়তার প্রতিটি পথ যেন মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠেছে।

শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার অভাবে বর্তমানে প্রতি ১০ জন শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে। দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি হতে পারে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস।

নতুন করে উচ্ছেদের হুমকি

গাজা উপত্যকার উত্তরের অন্তত ১৬টি এলাকা নতুন করে উচ্ছেদের হুমকির মুখে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র ঘোষণা দিয়েছেন, গাজা শহর ও জাবালিয়ার নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বাসিন্দাদের দ্রুত দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাওয়াসির অঞ্চলে সরিয়ে যেতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ—ফের নতুন করে গৃহচ্যুতি, অসহায়ত্ব এবং মৃত্যু।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ: আলোচনার টেবিলে মানবতা

এদিকে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে সমাধান খুঁজতে কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণে একটি কূটনৈতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সম্মেলনে যুদ্ধ বন্ধ, আইনি পদক্ষেপ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিতে আলোচনা চলছে।

গাজা উপত্যকা আজ এক চলমান গণকবরে পরিণত হয়েছে। যেখানে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু যেন বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কবর দেওয়ার জায়গা নেই, ত্রাণ নিতে গেলে বোমা পড়ে, এবং যাদের দাফন হয়, তাদের স্মরণ করবারও সময় নেই স্বজনদের। এই বাস্তবতায় বিশ্ব বিবেক কতদিন নীরব থাকবে? মানবতার পক্ষেই কি এখন কিছু করার সময় হয়নি?

গাজার আকাশে আজো বোমা বর্ষণ হয়, কিন্তু তাতে কেউ চমকে ওঠে না। কারণ সেখানে এখন চমকের কিছু নেই—আছে শুধু নিরব কান্না, মৃত্যু আর অপার মানবিক বিপর্যয়।