সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দোয়ার মাধ্যমে গড়ে উঠুক ঈমানদারদের বন্ধন

বিল্লাল হোসেন
  • Update Time : ০৬:৫৬:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫
  • / ১৯৯ Time View

1729566396 6443babab217f6ea1dd7ce53cd425471

1729566396 6443babab217f6ea1dd7ce53cd425471

দোয়া হলো এক অনন্য সাধন যার মাধ্যমে বান্দা সরাসরি তার প্রভুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তবে ইসলামে দোয়ার আরও এক বিশিষ্ট রূপ রয়েছে—তা হলো, অন্যের জন্য দোয়া। এটি শুধুমাত্র আত্মিক অনুশীলন নয়, বরং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। কুরআন ও হাদীসে বহুবার অন্যদের জন্য দোয়া করার কথা বলা হয়েছে। এ প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করবো, ইসলামে একে অপরের জন্য দোয়া করার গুরুত্ব, এর কুরআন-হাদীস ভিত্তিক ফজিলত, সামাজিক ও আত্মিক উপকারিতা এবং বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ।

 

কুরআনের আলোকে অন্যের জন্য দোয়ার নির্দেশনা দৃষ্টান্ত

কুরআনে বহু জায়গায় দেখা যায়, ঈমানদারদের পরস্পরের জন্য দোয়া করার তাগিদ রয়েছে। এটি শুধু পরোপকার নয়, বরং একটি পবিত্র ইবাদতের রূপ।

. ঈমানদারদের জন্য দোয়া করা আল্লাহর নির্দেশ

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আমাদের পূর্ববর্তী ঈমানদার ভাইদের ক্ষমা করে দাও।
— (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০)

এই আয়াতটি শুধু দোয়া নয়, বরং একটি শিক্ষা—আমাদের উচিত যারা ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের জন্যও নিয়মিতভাবে দোয়া করা।

. ইবরাহিম (আঃ)-এর দোয়াপরিবার মুমিনদের জন্য দৃষ্টান্ত

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং সমস্ত মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দাও, সেই দিনে যখন হিসাব কায়েম হবে।
— (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪১)

এখানে ইবরাহিম (আঃ) তাঁর পিতা-মাতা ও পুরো মুমিন সমাজের জন্য দোয়া করেছেন। এটি একটি নবি চরিত্রের আদর্শ, যা প্রতিটি মুসলিম অনুসরণ করতে পারে।

. ফেরেশতারা পর্যন্ত মুমিনদের জন্য দোয়া করেন

আর

যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার আশেপাশে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং মুমিনদের জন্য দোয়া করে বলেঃ হে আমাদের রব! তুমি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী দয়ালু, তুমি তাদের ক্ষমা করো…”
— (সূরা গাফির, আয়াত: ৭)

এ আয়াতে ফেরেশতাদের দোয়া করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে—যা একজন মুমিনের মর্যাদাকে যেমন বোঝায়, তেমনি অন্যের জন্য দোয়া করার পুণ্যকেও নির্দেশ করে।

 

হাদীসের আলোকে পারস্পরিক দোয়া

রাসূলুল্লাহ (সা.) একে অপরের জন্য দোয়া করতে মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন এবং একে একটি মহৎ ইবাদত বলে আখ্যায়িত করেছেন।

. গোপনে অন্যের জন্য দোয়াআল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়

যখন একজন মুসলমান তার ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করে, তখন একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে যে বলেআমীন! এবং তোমার জন্যও একই রকম হোক।
— (সহীহ মুসলিম: ২৭৩৩)

এই হাদীসটি বোঝায়, যখন আপনি কাউকে না জানিয়ে, নিঃস্বার্থভাবে তার কল্যাণের দোয়া করেন, তখন ফেরেশতা সেই দোয়া আপনার জন্যও করে। এটি এক অবিশ্বাস্য পুরস্কার।

. অন্যের জন্য দোয়াভালোবাসার নিদর্শন

তুমি তখনই পূর্ণ ঈমানদার হবে, যতক্ষণ না তুমি নিজের জন্য যা চাও, তা তোমার ভাইয়ের জন্যও চাও।
— (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)

অন্যের জন্য দোয়া করা মানে তার জন্য কল্যাণ কামনা করা, যেটি আমাদের ঈমানের পূর্ণতার মাপকাঠি।

. দোয়া মুসলিমদের মধ্যে দয়া ভ্রাতৃত্ব বাড়ায়

মুমিনরা পরস্পরের প্রতি করুণাশীল, দয়ালু সহানুভূতিশীল, যেমন একটি দেহ। দেহের এক অঙ্গ ব্যথা পেলে পুরো দেহই অস্থির হয়ে পড়ে।
— (সহীহ মুসলিম)

যখন আমরা কারো জন্য দোয়া করি, তখন এই সম্মিলিত অনুভূতি জাগ্রত হয়—যেখানে একজনের কষ্টকে সবাই ভাগ করে নেয়।

 

অন্যের জন্য দোয়া করার উপকারিতা তাৎপর্য

. দোয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক মজবুত হয়

আল্লাহর দরবারে কারো জন্য কল্যাণ চাওয়া মানে তার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রকাশ করা। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক হয় আরও দৃঢ়।

. নফসের পরিশুদ্ধি ঘটে

নিজের স্বার্থ ছেড়ে অন্যের জন্য দোয়া করা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার ভাঙে এবং হৃদয়কে নম্র করে তোলে।

. আল্লাহর রহমতের দ্বার খুলে যায়

হাদীস অনুযায়ী, গোপনে করা দোয়া দ্রুত কবুল হয় এবং আল্লাহ তাতে দয়া করেন উভয়ের ওপরই—যিনি দোয়া করেন ও যার জন্য দোয়া করা হয়।

 

বাস্তব জীবনে অন্যের জন্য যেভাবে দোয়া করা যায়

. নামাজের পর নির্দিষ্ট করে দোয়া করুন:

প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আপনি আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষকদের জন্য কল্যাণ ও মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করতে পারেন।

. কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়লে তার জন্য দোয়া করুন:

রোগী, হতদরিদ্র, দুর্যোগে পড়া ব্যক্তি বা কেউ চাকরির খোঁজে থাকলে—তাদের দুঃখে আপনার আন্তরিক দোয়া তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।

. মৃতদের জন্য দোয়া করুন:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তির জন্য সন্তান বা আত্মীয়ের দোয়া কবুল হয়। তাই আমাদের মৃত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের জন্য দোয়া করা উচিত।

 

কিছু বিশেষ দোয়া যা আমরা অন্যের জন্য করতে পারি

১. রোগীর জন্য:

اللَّهُمَّ اشْفِهِ شِفَاءً تَامًّا
“হে আল্লাহ! তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন।”

২. পরিবারের কল্যাণের জন্য:

اللَّهُمَّ احْفَظْ أَهْلِي وَأَحْبَائِي مِنْ كُلِّ سُوءٍ
“হে আল্লাহ! আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের সব অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।”

৩. ভাইবোনের ঈমান সফলতার জন্য:

اللَّهُمَّ ثَبِّتْ إِيمَانَهُ وَارْزُقْهُ نَجَاحًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
“হে আল্লাহ! তার ঈমানকে দৃঢ় করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন।”

 

একজন মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা, তার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করা, নিঃসন্দেহে ইসলামের অন্যতম মহৎ শিক্ষা। এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি, সম্পর্ক উন্নয়ন, এবং সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির এক অনন্য পন্থা। কুরআন ও হাদীস আমাদের শেখায়, নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে অন্যের জন্য দোয়া করাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব ও ঈমানের পরিচয়। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই চর্চা চালু রাখা উচিৎ। কারণ দোয়া শুধুমাত্র বাক্যের উচ্চারণ নয়, বরং এটি হৃদয় থেকে উৎসারিত এক প্রেম ও সহানুভূতির নিদর্শন।

 

সমাপ্তি দোয়া:

اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِمَّنْ يَدْعُونَ لِإِخْوَانِهِمْ بِالْخَيْرِ، وَيَسْتَجِيبُ لَنَا وَلَهُمْ
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা তাদের ভাইদের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, আর তুমি সেই দোয়া আমাদের ও তাদের জন্য কবুল করো। আমীন।”

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

বিল্লাল হোসেন

বিল্লাল হোসেন, একজন প্রজ্ঞাবান পেশাজীবী, যিনি গণিতের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে একটি সমৃদ্ধ ও বহুমুখী ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন। তার আর্থিক খাতে যাত্রা তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় নিয়ে গেছে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আল-রাজি ব্যাংকিং Inc. এবং ব্যাংক-আল-বিলাদে বিদেশী সম্পর্ক ও করেসপন্ডেন্ট মেইন্টেনেন্স অফিসার হিসেবে। প্রথাগত অর্থনীতির গণ্ডির বাইরে, বিল্লাল একজন প্রখ্যাত লেখক ও বিশ্লেষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে মননশীল কলাম ও গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। তার দক্ষতা বিস্তৃত বিষয় জুড়ে রয়েছে, যেমন অর্থনীতির জটিলতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, প্রবাসী শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট, রেমিটেন্স, রিজার্ভ এবং অন্যান্য সম্পর্কিত দিক। বিল্লাল তার লেখায় একটি অনন্য বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে একত্রিত করে একাডেমিক কঠোরতার সাথে। তার প্রবন্ধগুলো শুধুমাত্র জটিল বিষয়গুলির উপর গভীর বোঝাপড়ার প্রতিফলন নয়, বরং পাঠকদের জন্য জ্ঞানপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যা তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। বিল্লাল হোসেনের অবদান তার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে যে, তিনি আমাদের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বের জটিলতাগুলি উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি বিস্তৃত এবং আরও সূক্ষ্ম বোঝাপড়ার দিকে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।

দোয়ার মাধ্যমে গড়ে উঠুক ঈমানদারদের বন্ধন

Update Time : ০৬:৫৬:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫

1729566396 6443babab217f6ea1dd7ce53cd425471

দোয়া হলো এক অনন্য সাধন যার মাধ্যমে বান্দা সরাসরি তার প্রভুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। তবে ইসলামে দোয়ার আরও এক বিশিষ্ট রূপ রয়েছে—তা হলো, অন্যের জন্য দোয়া। এটি শুধুমাত্র আত্মিক অনুশীলন নয়, বরং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং উম্মাহর ভ্রাতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ। কুরআন ও হাদীসে বহুবার অন্যদের জন্য দোয়া করার কথা বলা হয়েছে। এ প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করবো, ইসলামে একে অপরের জন্য দোয়া করার গুরুত্ব, এর কুরআন-হাদীস ভিত্তিক ফজিলত, সামাজিক ও আত্মিক উপকারিতা এবং বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ।

 

কুরআনের আলোকে অন্যের জন্য দোয়ার নির্দেশনা দৃষ্টান্ত

কুরআনে বহু জায়গায় দেখা যায়, ঈমানদারদের পরস্পরের জন্য দোয়া করার তাগিদ রয়েছে। এটি শুধু পরোপকার নয়, বরং একটি পবিত্র ইবাদতের রূপ।

. ঈমানদারদের জন্য দোয়া করা আল্লাহর নির্দেশ

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আমাদের পূর্ববর্তী ঈমানদার ভাইদের ক্ষমা করে দাও।
— (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ১০)

এই আয়াতটি শুধু দোয়া নয়, বরং একটি শিক্ষা—আমাদের উচিত যারা ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের জন্যও নিয়মিতভাবে দোয়া করা।

. ইবরাহিম (আঃ)-এর দোয়াপরিবার মুমিনদের জন্য দৃষ্টান্ত

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং সমস্ত মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দাও, সেই দিনে যখন হিসাব কায়েম হবে।
— (সূরা ইবরাহিম, আয়াত: ৪১)

এখানে ইবরাহিম (আঃ) তাঁর পিতা-মাতা ও পুরো মুমিন সমাজের জন্য দোয়া করেছেন। এটি একটি নবি চরিত্রের আদর্শ, যা প্রতিটি মুসলিম অনুসরণ করতে পারে।

. ফেরেশতারা পর্যন্ত মুমিনদের জন্য দোয়া করেন

আর

যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার আশেপাশে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং মুমিনদের জন্য দোয়া করে বলেঃ হে আমাদের রব! তুমি সর্ববিষয়ে জ্ঞানী দয়ালু, তুমি তাদের ক্ষমা করো…”
— (সূরা গাফির, আয়াত: ৭)

এ আয়াতে ফেরেশতাদের দোয়া করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে—যা একজন মুমিনের মর্যাদাকে যেমন বোঝায়, তেমনি অন্যের জন্য দোয়া করার পুণ্যকেও নির্দেশ করে।

 

হাদীসের আলোকে পারস্পরিক দোয়া

রাসূলুল্লাহ (সা.) একে অপরের জন্য দোয়া করতে মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন এবং একে একটি মহৎ ইবাদত বলে আখ্যায়িত করেছেন।

. গোপনে অন্যের জন্য দোয়াআল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়

যখন একজন মুসলমান তার ভাইয়ের জন্য তার অনুপস্থিতিতে দোয়া করে, তখন একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে যে বলেআমীন! এবং তোমার জন্যও একই রকম হোক।
— (সহীহ মুসলিম: ২৭৩৩)

এই হাদীসটি বোঝায়, যখন আপনি কাউকে না জানিয়ে, নিঃস্বার্থভাবে তার কল্যাণের দোয়া করেন, তখন ফেরেশতা সেই দোয়া আপনার জন্যও করে। এটি এক অবিশ্বাস্য পুরস্কার।

. অন্যের জন্য দোয়াভালোবাসার নিদর্শন

তুমি তখনই পূর্ণ ঈমানদার হবে, যতক্ষণ না তুমি নিজের জন্য যা চাও, তা তোমার ভাইয়ের জন্যও চাও।
— (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)

অন্যের জন্য দোয়া করা মানে তার জন্য কল্যাণ কামনা করা, যেটি আমাদের ঈমানের পূর্ণতার মাপকাঠি।

. দোয়া মুসলিমদের মধ্যে দয়া ভ্রাতৃত্ব বাড়ায়

মুমিনরা পরস্পরের প্রতি করুণাশীল, দয়ালু সহানুভূতিশীল, যেমন একটি দেহ। দেহের এক অঙ্গ ব্যথা পেলে পুরো দেহই অস্থির হয়ে পড়ে।
— (সহীহ মুসলিম)

যখন আমরা কারো জন্য দোয়া করি, তখন এই সম্মিলিত অনুভূতি জাগ্রত হয়—যেখানে একজনের কষ্টকে সবাই ভাগ করে নেয়।

 

অন্যের জন্য দোয়া করার উপকারিতা তাৎপর্য

. দোয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক মজবুত হয়

আল্লাহর দরবারে কারো জন্য কল্যাণ চাওয়া মানে তার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা প্রকাশ করা। এর ফলে পারস্পরিক সম্পর্ক হয় আরও দৃঢ়।

. নফসের পরিশুদ্ধি ঘটে

নিজের স্বার্থ ছেড়ে অন্যের জন্য দোয়া করা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, অহংকার ভাঙে এবং হৃদয়কে নম্র করে তোলে।

. আল্লাহর রহমতের দ্বার খুলে যায়

হাদীস অনুযায়ী, গোপনে করা দোয়া দ্রুত কবুল হয় এবং আল্লাহ তাতে দয়া করেন উভয়ের ওপরই—যিনি দোয়া করেন ও যার জন্য দোয়া করা হয়।

 

বাস্তব জীবনে অন্যের জন্য যেভাবে দোয়া করা যায়

. নামাজের পর নির্দিষ্ট করে দোয়া করুন:

প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আপনি আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষকদের জন্য কল্যাণ ও মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করতে পারেন।

. কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়লে তার জন্য দোয়া করুন:

রোগী, হতদরিদ্র, দুর্যোগে পড়া ব্যক্তি বা কেউ চাকরির খোঁজে থাকলে—তাদের দুঃখে আপনার আন্তরিক দোয়া তাদের জীবন বদলে দিতে পারে।

. মৃতদের জন্য দোয়া করুন:

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তির জন্য সন্তান বা আত্মীয়ের দোয়া কবুল হয়। তাই আমাদের মৃত আত্মীয়স্বজন ও পূর্বপুরুষদের জন্য দোয়া করা উচিত।

 

কিছু বিশেষ দোয়া যা আমরা অন্যের জন্য করতে পারি

১. রোগীর জন্য:

اللَّهُمَّ اشْفِهِ شِفَاءً تَامًّا
“হে আল্লাহ! তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন।”

২. পরিবারের কল্যাণের জন্য:

اللَّهُمَّ احْفَظْ أَهْلِي وَأَحْبَائِي مِنْ كُلِّ سُوءٍ
“হে আল্লাহ! আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের সব অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।”

৩. ভাইবোনের ঈমান সফলতার জন্য:

اللَّهُمَّ ثَبِّتْ إِيمَانَهُ وَارْزُقْهُ نَجَاحًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
“হে আল্লাহ! তার ঈমানকে দৃঢ় করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন।”

 

একজন মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা, তার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করা, নিঃসন্দেহে ইসলামের অন্যতম মহৎ শিক্ষা। এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি, সম্পর্ক উন্নয়ন, এবং সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির এক অনন্য পন্থা। কুরআন ও হাদীস আমাদের শেখায়, নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়ে অন্যের জন্য দোয়া করাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব ও ঈমানের পরিচয়। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই চর্চা চালু রাখা উচিৎ। কারণ দোয়া শুধুমাত্র বাক্যের উচ্চারণ নয়, বরং এটি হৃদয় থেকে উৎসারিত এক প্রেম ও সহানুভূতির নিদর্শন।

 

সমাপ্তি দোয়া:

اللَّهُمَّ اجْعَلْنَا مِمَّنْ يَدْعُونَ لِإِخْوَانِهِمْ بِالْخَيْرِ، وَيَسْتَجِيبُ لَنَا وَلَهُمْ
“হে আল্লাহ! আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা তাদের ভাইদের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, আর তুমি সেই দোয়া আমাদের ও তাদের জন্য কবুল করো। আমীন।”