সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইয়েমেনে ভারতীয় নার্সের মৃত্যুদণ্ড আপাতত স্থগিত: শেষ আশার নাম ‘রক্তমূল্য’

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৯:৪৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫
  • / ১৭০ Time View

BeFunky collage 2025 07 15T181125136 2507151213

BeFunky collage 2025 07 15T181125136 2507151213

ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ফাঁসি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। ফাঁসির নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে শুরু হওয়া কূটনৈতিক এবং মানবিক তৎপরতার ফলেই এই সাময়িক স্বস্তি মিলেছে বলে জানা গেছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে নিমিশা মুক্তি পেয়েছেন বা শিগগিরই ভারতে ফিরতে পারবেন—তাঁর বাঁচার একমাত্র আশার নাম এখন ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তমূল্য।

কে এই নিমিশা প্রিয়া?

কেরালার বাসিন্দা নিমিশা প্রিয়া ২০০৮ সালে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে নার্স হিসেবে ইয়েমেনে পাড়ি জমান। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করলেও পরে সানায় একটি ব্যক্তিগত ক্লিনিক চালু করেন। স্থানীয় আইন মেনে তিনি ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে তলাল আবদুল মেহেদি নামের এক ইয়েমেনি নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু অচিরেই মেহেদি তাঁর প্রতি হয়রানি শুরু করেন, অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং তাঁর পাসপোর্ট আটকে দেন—ফলে নিমিশার দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মর্মান্তিক ঘটনার সূচনা

২০১৭ সালে দেশে ফেরার মরিয়া চেষ্টায় নিমিশা মেহেদিকে চেতনানাশক ইনজেকশন দেন, উদ্দেশ্য ছিল অচেতন অবস্থায় পাসপোর্ট উদ্ধার করে পালানো। কিন্তু ইনজেকশনের প্রভাবে মেহেদির মৃত্যু হয়। পালানোর সময়ই নিমিশাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে স্থানীয় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ভারতের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী নিয়োগ করলেও তার আপিল খারিজ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে ইয়েমেনের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং পরে প্রেসিডেন্টও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন।

রক্তমূল্যই এখন শেষ আশ্রয়

সম্প্রতি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরমণি জানান, “সরকার যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছে। এখন একমাত্র পথ হলো নিহত ব্যক্তির পরিবার যদি ব্লাড মানি গ্রহণ করতে রাজি হয়।”

ইসলামিক শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, ‘দিয়া’ বা রক্তমূল্য হলো এমন এক আর্থিক ক্ষতিপূরণ যা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহতের পরিবারের সম্মতিতে প্রদান করে। এই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলে নিহতের পরিবার অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করতে পারে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে ভুক্তভোগী পরিবারের ইচ্ছার ওপর।

ইয়েমেনি পরিবারের সিদ্ধান্তেই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ

বর্তমানে নিমিশা সানার একটি কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ভারতীয় দূতাবাস এবং কেরালা সরকারের সহায়তায় তাঁর প্রাণ বাঁচাতে ইয়েমেনি পরিবারের সঙ্গে আপসের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় কারা কর্তৃপক্ষ এবং প্রসিকিউশন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেই এই সাময়িক স্থগিতাদেশ নিশ্চিত হয়েছে।

তবে এখনও চূড়ান্ত কোনো সমাধান হয়নি। নিহতের পরিবার যদি রক্তমূল্য গ্রহণে রাজি হয়, তবেই নিমিশার মৃত্যুদণ্ড রদ হতে পারে। তা না হলে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

কী এইব্লাড মানি‘?

দিয়াবা ব্লাড মানি ইসলামিক আইন অনুসারে একটি ক্ষতিপূরণমূলক ব্যবস্থা, যা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়। এটি ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে প্রদান করা হয়। এই ব্যবস্থায় সরকার নয়, বরং নিহতের পরিবারই অপরাধীর ভাগ্য নির্ধারণ করে। তারা চাইলে হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে পারে কিংবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণের বিনিময়ে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করতে পারে।

নিমিশা প্রিয়ার জীবন-মরণ আজ ঝুলে আছে ইয়েমেনি পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর। এই মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক নজর কাড়লেও এর সমাধান একান্তভাবেই নির্ভর করছে শরিয়াহ অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদানের সুযোগ গ্রহণের ওপর। আপাতত ফাঁসি স্থগিত হলেও, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মানবিক আবেদন ইয়েমেনি পরিবারকে ব্লাড মানি গ্রহণে কতটা প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের জন্য এ লড়াই শুধু একজন নার্সের জীবন বাঁচানোর নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের এক কঠিন পরীক্ষাও বটে।

সূত্র: NDTV, ইয়েমেন বিচার বিভাগীয় নথিপত্র, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বক্তব্য।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইয়েমেনে ভারতীয় নার্সের মৃত্যুদণ্ড আপাতত স্থগিত: শেষ আশার নাম ‘রক্তমূল্য’

Update Time : ০৯:৪৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই ২০২৫

BeFunky collage 2025 07 15T181125136 2507151213

ইয়েমেনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ফাঁসি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। ফাঁসির নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে শুরু হওয়া কূটনৈতিক এবং মানবিক তৎপরতার ফলেই এই সাময়িক স্বস্তি মিলেছে বলে জানা গেছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে নিমিশা মুক্তি পেয়েছেন বা শিগগিরই ভারতে ফিরতে পারবেন—তাঁর বাঁচার একমাত্র আশার নাম এখন ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তমূল্য।

কে এই নিমিশা প্রিয়া?

কেরালার বাসিন্দা নিমিশা প্রিয়া ২০০৮ সালে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে নার্স হিসেবে ইয়েমেনে পাড়ি জমান। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করলেও পরে সানায় একটি ব্যক্তিগত ক্লিনিক চালু করেন। স্থানীয় আইন মেনে তিনি ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে তলাল আবদুল মেহেদি নামের এক ইয়েমেনি নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু অচিরেই মেহেদি তাঁর প্রতি হয়রানি শুরু করেন, অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং তাঁর পাসপোর্ট আটকে দেন—ফলে নিমিশার দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মর্মান্তিক ঘটনার সূচনা

২০১৭ সালে দেশে ফেরার মরিয়া চেষ্টায় নিমিশা মেহেদিকে চেতনানাশক ইনজেকশন দেন, উদ্দেশ্য ছিল অচেতন অবস্থায় পাসপোর্ট উদ্ধার করে পালানো। কিন্তু ইনজেকশনের প্রভাবে মেহেদির মৃত্যু হয়। পালানোর সময়ই নিমিশাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে স্থানীয় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। ভারতের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী নিয়োগ করলেও তার আপিল খারিজ হয়ে যায়। ২০২৩ সালে ইয়েমেনের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং পরে প্রেসিডেন্টও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন।

রক্তমূল্যই এখন শেষ আশ্রয়

সম্প্রতি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরমণি জানান, “সরকার যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছে। এখন একমাত্র পথ হলো নিহত ব্যক্তির পরিবার যদি ব্লাড মানি গ্রহণ করতে রাজি হয়।”

ইসলামিক শরিয়াহ আইন অনুযায়ী, ‘দিয়া’ বা রক্তমূল্য হলো এমন এক আর্থিক ক্ষতিপূরণ যা হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহতের পরিবারের সম্মতিতে প্রদান করে। এই ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করলে নিহতের পরিবার অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করতে পারে। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়; সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে ভুক্তভোগী পরিবারের ইচ্ছার ওপর।

ইয়েমেনি পরিবারের সিদ্ধান্তেই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ

বর্তমানে নিমিশা সানার একটি কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ভারতীয় দূতাবাস এবং কেরালা সরকারের সহায়তায় তাঁর প্রাণ বাঁচাতে ইয়েমেনি পরিবারের সঙ্গে আপসের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় কারা কর্তৃপক্ষ এবং প্রসিকিউশন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেই এই সাময়িক স্থগিতাদেশ নিশ্চিত হয়েছে।

তবে এখনও চূড়ান্ত কোনো সমাধান হয়নি। নিহতের পরিবার যদি রক্তমূল্য গ্রহণে রাজি হয়, তবেই নিমিশার মৃত্যুদণ্ড রদ হতে পারে। তা না হলে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

কী এইব্লাড মানি‘?

দিয়াবা ব্লাড মানি ইসলামিক আইন অনুসারে একটি ক্ষতিপূরণমূলক ব্যবস্থা, যা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়। এটি ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত হত্যার ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে প্রদান করা হয়। এই ব্যবস্থায় সরকার নয়, বরং নিহতের পরিবারই অপরাধীর ভাগ্য নির্ধারণ করে। তারা চাইলে হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে পারে কিংবা ক্ষতিপূরণ গ্রহণের বিনিময়ে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করতে পারে।

নিমিশা প্রিয়ার জীবন-মরণ আজ ঝুলে আছে ইয়েমেনি পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপর। এই মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক নজর কাড়লেও এর সমাধান একান্তভাবেই নির্ভর করছে শরিয়াহ অনুযায়ী রক্তমূল্য প্রদানের সুযোগ গ্রহণের ওপর। আপাতত ফাঁসি স্থগিত হলেও, সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং মানবিক আবেদন ইয়েমেনি পরিবারকে ব্লাড মানি গ্রহণে কতটা প্রভাবিত করতে পারে। ভারতের জন্য এ লড়াই শুধু একজন নার্সের জীবন বাঁচানোর নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের এক কঠিন পরীক্ষাও বটে।

সূত্র: NDTV, ইয়েমেন বিচার বিভাগীয় নথিপত্র, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বক্তব্য।