যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় বেনজীর আহমেদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ: দুর্নীতির তদন্তে নতুন অগ্রগতি
- Update Time : ১০:০৭:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
- / ১৭২ Time View

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলায় নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ায় তাঁর নামে থাকা একাধিক সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ ও অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে এই আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. জাকির হোসেন গালিব।
সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম আদালতে আবেদন করেন বেনজীর আহমেদের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে থাকা দুটি স্থাবর সম্পদ এবং স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংকের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের জন্য। একইসাথে মালয়েশিয়ার সিআইএমবি ইসলামিক ব্যাংকে থাকা আরও দুটি অ্যাকাউন্টও অবরুদ্ধের দাবি জানান তিনি।
দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ প্রায় ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন, যা তিনি বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে অর্জন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে তিনি এসব সম্পদ আত্মীয়-স্বজনের নামে স্থানান্তরের চেষ্টা করছেন—এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরই দুদক দ্রুত আদালতের হস্তক্ষেপ চায়।
দুদকের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, মামলাটি এখনও তদন্তাধীন এবং তদন্ত চলাকালীন এই সম্পদ হস্তান্তর হয়ে গেলে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের পর রাষ্ট্রের পক্ষে বাজেয়াপ্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষিতে আদালতে চার্জশিট দাখিলের আগেই এসব সম্পদ জব্দের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
উল্লেখ্য, এর আগেও গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর, বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই কন্যার বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে চারটি পৃথক মামলা দায়ের করে দুদক। সেই মামলাগুলোর তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। বেনজীরের বিরুদ্ধে সম্পদের হিসাব গোপন, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থের অপব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যাপক বিতর্ক ও প্রভাব
এই সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের আদেশের মাধ্যমে মামলার তদন্তে একটি বড় অগ্রগতি হলো। দেশের সাবেক পুলিশপ্রধানের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের ইঙ্গিতও বহন করে।
দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলাটি কেবল দেশীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় শুরু হয়েছে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোড়ন
এমন একজন উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বড় পরিসরের দুর্নীতির অভিযোগ শুধু সাধারণ মানুষ নয়, প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি কীভাবে এত পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেন এবং এতদিন তা নজরে এল না কেন? এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরের দুর্নীতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভবিষ্যতের দিকে নজর
দুদক সূত্র জানিয়েছে, চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে আরও অনেক সম্পদের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী এই সম্পদগুলো জব্দ থাকায় তদন্ত সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একইসাথে, ভবিষ্যতে মামলার রায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এই অবৈধ সম্পদ ফেরত আনার পথ সুগম হবে।
এই প্রক্রিয়ায় যদি সফলতা আসে, তবে এটি বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। একইসাথে, এটি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার সাহসী প্রয়াস হিসেবে গণ্য হবে।













