সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হুমকি সুইস বিনিয়োগকারীর

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৩৮:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
  • / ১৯৯ Time View

1752470130 e06d061a77a7bde916b8a91163029d41

1752470130 e06d061a77a7bde916b8a91163029d41

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ২০০৮ সালের একটি চুক্তি লঙ্ঘন ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের (সাবেক ওরিয়েন্টাল ব্যাংক) বৃহৎ শেয়ারহোল্ডার। ৭ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বরাবর পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এই হুমকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৮ সালের চুক্তি এবং বিনিয়োগ

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এক উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৫৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। চুক্তির ভিত্তিতে তারা তৎকালীন ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগের শর্তে বলা ছিল, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার থাকবে দায়মুক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ থাকবে আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের হাতেই।

তবে এরপর, ব্যাংকটির সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন, যার ফলে শেয়ার হস্তান্তর ও মালিকানা নিয়ন্ত্রণে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। মামলাগুলো এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগ

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ বলছে, আদালতের মামলার জেরে তারা এখন আর ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে বসায়।

এই অবস্থাকে বিনিয়োগের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে দাবি করেছে আইসিবি। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, “আমরা যদি ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পাই, তাহলে আমাদের বিনিয়োগ ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাব।”

আনুষ্ঠানিক চিঠি হুঁশিয়ারি

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের চেয়ারপারসন জোসেফিন সিভারেতনাম চিঠির মাধ্যমে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। গভর্নর ছাড়াও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদবাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী

আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী)-কে।

চিঠিতে বলা হয়েছে—

“পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত আপনার পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করি। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সালিশি আদালতে যেতে বাধ্য হব।”

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়,

“আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের বিনিয়োগ নিরাপদ ও দায়মুক্ত থাকার নিশ্চয়তা ছিল চুক্তিতে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক দিতে পারেনি। উপরন্তু, আমাদের মনোনীত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগও বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়নি। বরং তারা নিজস্ব কর্মকর্তাকে বসিয়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে, যা চুক্তির পরিপন্থী।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন,

“আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের বিনিয়োগ একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল। এখন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় আইনি সমাধান খুঁজে পাওয়া গেলে সেটাই হবে সবার জন্য ইতিবাচক।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার বাধায় অনেক সময় চুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।

বিশ্লেষণ: আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে পৌঁছে যায়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। কারণ, একটি স্বীকৃত ও লিখিত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আদালতে একটি মামলা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের হুমকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন বিষয়টির দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি করতে না পারলে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না থেকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক জটিলতায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার যদি সম্মিলিতভাবে এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হুমকি সুইস বিনিয়োগকারীর

Update Time : ১১:৩৮:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

1752470130 e06d061a77a7bde916b8a91163029d41

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ২০০৮ সালের একটি চুক্তি লঙ্ঘন ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের (সাবেক ওরিয়েন্টাল ব্যাংক) বৃহৎ শেয়ারহোল্ডার। ৭ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বরাবর পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এই হুমকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৮ সালের চুক্তি এবং বিনিয়োগ

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ ২০০৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এক উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৫৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়। চুক্তির ভিত্তিতে তারা তৎকালীন ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। বিনিয়োগের শর্তে বলা ছিল, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার থাকবে দায়মুক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ থাকবে আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের হাতেই।

তবে এরপর, ব্যাংকটির সাবেক শেয়ারহোল্ডাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করেন, যার ফলে শেয়ার হস্তান্তর ও মালিকানা নিয়ন্ত্রণে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। মামলাগুলো এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগ

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপ বলছে, আদালতের মামলার জেরে তারা এখন আর ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে বসায়।

এই অবস্থাকে বিনিয়োগের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে দাবি করেছে আইসিবি। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, “আমরা যদি ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পাই, তাহলে আমাদের বিনিয়োগ ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাব।”

আনুষ্ঠানিক চিঠি হুঁশিয়ারি

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের চেয়ারপারসন জোসেফিন সিভারেতনাম চিঠির মাধ্যমে এই অবস্থান স্পষ্ট করেন। গভর্নর ছাড়াও চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদবাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর

নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী)-কে।

চিঠিতে বলা হয়েছে—

“পুরো বিষয়টি নিয়ে আমরা দ্রুত আপনার পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ আশা করি। ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সালিশি আদালতে যেতে বাধ্য হব।”

চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়,

“আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের বিনিয়োগ নিরাপদ ও দায়মুক্ত থাকার নিশ্চয়তা ছিল চুক্তিতে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক দিতে পারেনি। উপরন্তু, আমাদের মনোনীত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগও বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দেয়নি। বরং তারা নিজস্ব কর্মকর্তাকে বসিয়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে, যা চুক্তির পরিপন্থী।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন,

“আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের বিনিয়োগ একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ছিল। এখন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় আইনি সমাধান খুঁজে পাওয়া গেলে সেটাই হবে সবার জন্য ইতিবাচক।”

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময় দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার বাধায় অনেক সময় চুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়।

বিশ্লেষণ: আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে পৌঁছে যায়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। কারণ, একটি স্বীকৃত ও লিখিত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক আদালতে একটি মামলা দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও

আইসিবি ফিনান্সিয়াল গ্রুপের হুমকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন বিষয়টির দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি করতে না পারলে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না থেকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক জটিলতায় পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার যদি সম্মিলিতভাবে এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।