তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও
- Update Time : ০৭:১৬:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
- / ২৪২ Time View

পবিত্র আল-কুরআন মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এর প্রতিটি আয়াত এক একটি আলো, এক একটি দিকনির্দেশনা, যা মানুষকে গহিন অন্ধকার থেকে সত্যের পথে, হেদায়াতের পথে, জান্নাতের পথে আহ্বান জানায়। সূরা আলে ইমরানের ১৩৩ নম্বর আয়াত তেমনই একটি আয়াত—যা শুধু একটি বাক্য নয়, বরং একটি চেতনা, একটি অন্তর্জাগরণ, একটি মোড় ঘোরানো আহ্বান। এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের ডেকে বলছেন:
﴿وَسَارِعُوٓا۟ إِلَىٰ مَغْفِرَةٍۢ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا ٱلسَّمَـٰوَٰتُ وَٱلْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ﴾
“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।”
(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৩)
এই আয়াতটি অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যময়। একদিকে এতে রয়েছে তাওবার গুরুত্ব, অন্যদিকে জান্নাতের আকর্ষণ, আবার আছে তাকওয়া অর্জনের জন্য এক দৃঢ় নির্দেশনা। এটি একটি বিশাল বার্তা, যা আল্লাহ আমাদের ব্যক্তিগতভাবে পৌঁছে দিচ্ছেন।
প্রথমেই আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে: “ওয়া সাবিকু” — অর্থাৎ, ‘ধাবিত হও’, ‘তাড়াতাড়ি করো’। এই শব্দটি কেবল সময়কে মূল্যায়নের আহ্বানই নয়, বরং তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জান্নাতের পথে দেরি করলে শয়তান ও নফস আমাদের প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দেবে। তাই আল্লাহ বলছেন, “তোমরা ছুটে চলো, তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে।” এই ‘ছুটে চলা’ যেন কেবল বাহ্যিক কাজ নয়, বরং এক অভ্যন্তরীণ বিপ্লব—আত্মশুদ্ধির, আত্মনির্মাণের এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের।
আল্লাহ ক্ষমার কথা উল্লেখ করে জান্নাতের দাওয়াত দিয়েছেন। কেননা, জান্নাত পাওয়ার প্রথম শর্ত হলো তাঁর ক্ষমা। মানুষ যত বড় ইবাদতকারীই হোক, যদি আল্লাহ ক্ষমা না করেন, তবে তার জান্নাত লাভ অসম্ভব। কাজেই প্রতিটি মুসলমানের প্রতিদিনের করণীয় হওয়া উচিত তাওবা করা, নিজের ভুল ও গোনাহর জন্য অনুতপ্ত হওয়া, এবং আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এরপর আল্লাহ বলেন, এই জান্নাতের প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। এটি এমন এক রূপক চিত্র, যা আমাদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বেলে দেয়। অনেক সময় মানুষ ভাবে, তার পাপ এত বেশি যে সে কখনো জান্নাতের উপযুক্ত হতে পারে না। অথচ আল্লাহ বলছেন, জান্নাত এতই প্রশস্ত যে তার পরিধি আসমান ও জমিনের সমান। অর্থাৎ, এতে প্রত্যেক অনুতপ্ত, তাওবাকারী, মুত্তাকী ও সৎকর্মশীল ব্যক্তির জন্য স্থান রয়েছে।
তবে এই জান্নাত কেবল তাদের জন্য নয় যারা বাহ্যিকভাবে ইবাদতে নিয়োজিত, বরং তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ‘তাকওয়া’ বা পরহেযগারিতা রয়েছে। আয়াতের শেষাংশে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “অউ’ইদাত লিল মুত্তাকীন” — এটি মুত্তাকীদের জন্য তৈরি। মুত্তাকী বলতে বুঝায় সেই মানুষ, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, প্রতিটি কাজে তাঁর সন্তুষ্টি বিবেচনায় রাখেন এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার আন্তরিক চেষ্টা করেন।
কিন্তু কেউ কিভাবে মুত্তাকী হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ থেকে ১৩৬ নম্বর আয়াতে পাই। সেখানে বলা হয়েছে, মুত্তাকীরা হলো তারাই যারা সংকটে ও স্বচ্ছলতায় আল্লাহর পথে দান করে, রাগ সংবরণ করে, মানুষকে ক্ষমা করে, আর যখন গোনাহ করে, তখন সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারা নিজেদের গোনাহের ওপর অনড় থাকে না। এ হলো মুত্তাকীর প্রকৃত পরিচয়।
আসলে এই গুণাবলিগুলো অর্জন করা সহজ নয়। কিন্তু এই আয়াতের নির্দেশনা হলো, তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করা। আমরা দেরি করতে করতে জীবনটাই হয়তো শেষ করে ফেলি। তাই আজ, এই মুহূর্ত থেকেই শুরু করতে হবে—তাওবা, দান, ক্ষমাশীলতা, রাগ সংবরণ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তোলা।
এই আয়াত আমাদের একটি ব্যক্তিগত ডাকও হতে পারে। যেন আল্লাহ নিজ হাতে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলছেন—“তোমার জন্য আমার জান্নাত প্রস্তুত, তুমি শুধু ফিরে এসো, আমায় ডাকো, আমার ক্ষমার দিকে এগিয়ে চলো।” এই ডাক অস্বীকার করার অর্থ নিজেরই ক্ষতি করা। তাই আমাদের উচিত প্রতিদিন এই আয়াত স্মরণ করা এবং নিজেদের জিজ্ঞেস করা: “আমি কি জান্নাতের দিকে ছুটছি, নাকি দুনিয়ার মোহে পিছিয়ে যাচ্ছি?”
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ব্যস্ততা, দায়িত্ব, চ্যালেঞ্জ থাকে। কিন্তু যে চূড়ান্ত লক্ষ্য জান্নাত, তা যদি আমরা চোখে না রাখি, তাহলে আমাদের পরিশ্রমের ফল হবে ক্ষণস্থায়ী, সীমিত ও শেষপর্যন্ত অর্থহীন। এই আয়াত আমাদের জীবনকে দৃষ্টিভঙ্গির এক নতুন দরজায় দাঁড় করায়—আমাদের চিন্তা, কাজ, ব্যস্ততা সবই যেন জান্নাতমুখী হয়।
আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আয়াত একটি মূল্যবান উপহার। এর আলোয় যদি আমরা নিজের জীবনকে গড়তে পারি, তবে আমরা শুধু জান্নাতের পথেই এগোব না, বরং একজন পরিপূর্ণ মানুষ, সমাজ ও বিশ্ববাসীর কল্যাণকামী মুমিন হিসেবেও গড়ে উঠতে পারব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই আয়াতের আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন, আমাদেরকে সচ্চরিত্র, মুত্তাকী বান্দায় পরিণত করুন এবং চিরন্তন জান্নাতের অধিবাসী করে তুলুন।
আমিন।













