সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উত্তাল দেশ: সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে সর্বস্তরের মানুষ, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ-বিক্ষুব্ধ জনতা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৪৯:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
  • / ১৪২ Time View

1752339575 5cd1fbd61eb03c3a29c5dae2e73c448e

1752339575 5cd1fbd61eb03c3a29c5dae2e73c448e
 সোহাগের স্বজনদের আহাজারি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল রাতে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল

 

রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে। প্রকাশ্যে পাথর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার মতো বর্বর ঘটনায় সারা দেশে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মশাল মিছিল, সংবাদ সম্মেলন এবং সমাবেশে উত্তাল হয়ে ওঠে জনসাধারণ, শিক্ষার্থীরা, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকেরা।

রাজপথে প্রতিবাদের ঢেউ
সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে শনিবার সকাল থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গর্জে ওঠে জনসাধারণ। রাজধানীর পুরান পল্টন, বায়তুল মোকাররম, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, সাতরাস্তা, উত্তরা, ডেমরা, চকবাজার, যাত্রাবাড়ীসহ একাধিক এলাকায় রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয় ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি। প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, এবং প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। কর্মসূচির মধ্যে ছিল বিক্ষোভ মিছিল, পথসভা, মানববন্ধন এবং নাগরিক অবস্থান। শুধু রাজধানী নয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা, কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর, মাগুরা ও গাজীপুরের মতো জেলা শহরগুলোতেও সাধারণ মানুষ, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসেন। প্রতিটি জেলায় গড়ে ওঠে বিচারের দাবিতে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদী গণঐক্য। গোটা দেশে যেন ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন, যার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

জামায়াত ছাত্রশিবিরের কর্মসূচি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকার দক্ষিণ ও উত্তরের বিভিন্ন শাখার নেতৃত্বে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, সাতরাস্তা ও উত্তরায় বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিল শেষে দেওয়া বক্তব্যে জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা আওয়ামী দুঃশাসনের ফসল। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান ও বিরোধী দল—উভয়েই সন্ত্রাসকে লালন করছে।

ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভ হয়। তারা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এ ধরনের খুনের ঘটনা ঘটতে পারে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় মশাল মিছিল—এতে অংশ নেন ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ: শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে সরব ক্যাম্পাস

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় ব্যবসায়ী সোহাগকে প্রকাশ্যে পাথর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুরতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। তাই দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে, আয়োজন করে মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিল, মশাল মিছিল ও সমাবেশ। এসব বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলে।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)
উত্তরের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোহাগ হত্যার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানায়। প্যারিস রোডে শিক্ষার্থীরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন। এছাড়া রাবির বুদ্ধিজীবী চত্বরে ছাত্রদলের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা ও মিছিল। বক্তারা বলেন, একজন সাধারণ ব্যবসায়ী যদি প্রকাশ্যে খুন হন এবং বিচার না হয়, তবে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়? তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবেই এই হত্যাকাণ্ডে বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রদলের উদ্যোগে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, পাথর নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা করা একটি সভ্য রাষ্ট্রে অকল্পনীয়। তারা জোর দাবি জানান—এই নৃশংসতার নেপথ্যে যারাই থাকুক, তাদের দলীয় পরিচয় না দেখে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সৃষ্টি হয় উত্তেজনা ও প্রতিবাদের জোয়ার। বিকেলের দিকে বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আয়োজিত হয় মশাল মিছিল। পাশাপাশি ছাত্রদলও আলাদাভাবে মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়ক পর্যন্ত।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বলেন, দেশে একের পর এক ভয়ংকর অপরাধ ঘটছে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতির ও পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া নির্মূলের দাবিও তোলেন।

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আয়োজিত হয় প্রতিবাদ সমাবেশ। একইসঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট, মানারাত, মেরিটাইম, নর্দান ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
তারা বলেন, ‘আজ যদি একজন ব্যবসায়ী এইভাবে প্রাণ হারান, কাল তা হতে পারে আমাদের কারো ভাই, বাবা বা বন্ধুর ক্ষেত্রেও।’
বিক্ষোভকারীরা এক কণ্ঠে দাবি তোলেন—এই ঘটনার বিচার যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হয় এবং অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে পালিয়ে না যেতে পারে। পাশাপাশি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ করা হোক।

 

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সোহাগ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি যেন গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেশব্যাপী এক সচেতনতার বার্তা দিয়েছে। এই বার্তা স্পষ্ট—অপরাধ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মেনে নেওয়া হবে না।

বিভিন্ন জেলার প্রতিবাদ: দেশব্যাপী উত্তাল জনমত

সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে আসে। ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা সোহাগ হত্যার প্রতিবাদ জানায় এবং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তোলে। প্রতিটি জেলাতেই এক অনন্য উত্তেজনা, আবেগ এবং প্রতিরোধের চিত্র ফুটে ওঠে।

চট্টগ্রাম

বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সদরঘাট ও কোতোয়ালি থানার অধীনে একাধিক স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। তারা দাবি করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বক্তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে খুনিদের শাস্তির জোর দাবি জানান।

রাজশাহী

রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, যা দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ ছাড়া রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শিক্ষার্থীরা হাতে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে গৌরহাঙ্গা রেলগেট এলাকায় এসে সমাবেশে পরিণত হয়। বক্তারা বলেন, এই হত্যার পেছনে যেই থাকুক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

রংপুর

উত্তরের শহর রংপুরেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ। রংপুর জিলা স্কুল থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল বের করে নগরীর প্রধান সড়ক ঘুরে আসে।

একই সময় রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তারা বলেন, দেশে আর কোনো মানুষ যেন প্রকাশ্যে এভাবে নিহত না হয়, তার জন্যই সোহাগ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রয়োজন।

মাগুরা

মাগুরা শহরের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলটি সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভায়না মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, এ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর ও টঙ্গী

এই তিন জেলাতেও জনগণের ক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

কুড়িগ্রামে, সর্বস্তরের ছাত্রসমাজ শহরের বিভিন্ন মোড়ে মিছিল করে ও বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেয়। তারা বলেন, খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধটাই মুখ্য—এমন নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

পিরোজপুরে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ছাত্র ও জনতার ব্যানারে মিছিল বের হয়, যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বক্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদ জানান।

টঙ্গীতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় যুবশক্তির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। চেরাগআলী এলাকা থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে কলেজগেট এলাকায় এসে মহাসড়ক আটকে প্রতিবাদ জানানো হয়। তারা বলেন, বারবার জনসমক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে কিন্তু বিচার হচ্ছে না—এটা জাতির জন্য ভয়ংকর বার্তা।

 

এইসব প্রতিবাদ শুধু একটি হত্যার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং গোটা জাতির ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ, আতঙ্ক এবং ন্যায়ের আহ্বান। এই প্রতিবাদগুলো যেন একটি বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশের মানুষ এখন আর অপরাধ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি মেনে নিতে চায় না।

রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার বহিঃপ্রকাশ। দখলবাজির রাজনীতির পরিণতি হিসেবে এসব বর্বরতা জন্ম নিচ্ছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব কাজী মো. মামুনুর রশিদ এক বিবৃতিতে বলেন, এই হত্যাকাণ্ড জাহিলি বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। সরকারের ওপর মানুষের আস্থা নেই।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা আশরাফুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

জাতীয় সংস্কার জোটের নেতা মো. আবদুর রহিম বলেন, এই হত্যাকাণ্ড শুধুই একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চুরমার করেছে।

সরকারের অবস্থান পদক্ষেপ

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি জানান, সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও আশ্বাস দেন, কেউ ছাড় পাবে না। অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হবেই।

র‌্যাব ডিজি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, অপরাধী কোন দলের সেটি বিবেচ্য নয়, অপরাধী মানেই অপরাধী। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ও পুলিশ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।

সোহাগ হত্যাকাণ্ড যেন গোটা জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। একদিকে রাজপথে প্রতিবাদ, অন্যদিকে সরকারের বিচারের আশ্বাস—এই দ্বৈত প্রবাহের মাঝে জনসাধারণ এখন চায়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে যেন এমন বর্বরতা আর না ঘটে। এ বিচার শুধু সোহাগের জন্য নয়, এ বিচার চাই জাতীয় নিরাপত্তা ও ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উত্তাল দেশ: সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে সর্বস্তরের মানুষ, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ-বিক্ষুব্ধ জনতা

Update Time : ১১:৪৯:৪১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
1752339575 5cd1fbd61eb03c3a29c5dae2e73c448e
 সোহাগের স্বজনদের আহাজারি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল রাতে শিক্ষার্থীদের মশাল মিছিল

 

রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে। প্রকাশ্যে পাথর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার মতো বর্বর ঘটনায় সারা দেশে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন, মশাল মিছিল, সংবাদ সম্মেলন এবং সমাবেশে উত্তাল হয়ে ওঠে জনসাধারণ, শিক্ষার্থীরা, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকেরা।

রাজপথে প্রতিবাদের ঢেউ
সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে শনিবার সকাল থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গর্জে ওঠে জনসাধারণ। রাজধানীর পুরান পল্টন, বায়তুল মোকাররম, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, সাতরাস্তা, উত্তরা, ডেমরা, চকবাজার, যাত্রাবাড়ীসহ একাধিক এলাকায় রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয় ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচি। প্ল্যাকার্ড, পোস্টার, এবং প্রতিবাদী স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। কর্মসূচির মধ্যে ছিল বিক্ষোভ মিছিল, পথসভা, মানববন্ধন এবং নাগরিক অবস্থান। শুধু রাজধানী নয়, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা, কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর, মাগুরা ও গাজীপুরের মতো জেলা শহরগুলোতেও সাধারণ মানুষ, ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসেন। প্রতিটি জেলায় গড়ে ওঠে বিচারের দাবিতে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদী গণঐক্য। গোটা দেশে যেন ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন, যার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

জামায়াত ছাত্রশিবিরের কর্মসূচি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকার দক্ষিণ ও উত্তরের বিভিন্ন শাখার নেতৃত্বে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম, সাতরাস্তা ও উত্তরায় বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিল শেষে দেওয়া বক্তব্যে জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির ভয়াবহতা আওয়ামী দুঃশাসনের ফসল। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান ও বিরোধী দল—উভয়েই সন্ত্রাসকে লালন করছে।

ছাত্রশিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগ এলাকায় বিক্ষোভ হয়। তারা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ছাড়া এ ধরনের খুনের ঘটনা ঘটতে পারে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় মশাল মিছিল—এতে অংশ নেন ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ: শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদে সরব ক্যাম্পাস

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় ব্যবসায়ী সোহাগকে প্রকাশ্যে পাথর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এ ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুরতার প্রতীক হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। তাই দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে, আয়োজন করে মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিল, মশাল মিছিল ও সমাবেশ। এসব বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার দাবি তোলে।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)
উত্তরের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সোহাগ হত্যার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ জানায়। প্যারিস রোডে শিক্ষার্থীরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেন। এছাড়া রাবির বুদ্ধিজীবী চত্বরে ছাত্রদলের ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা ও মিছিল। বক্তারা বলেন, একজন সাধারণ ব্যবসায়ী যদি প্রকাশ্যে খুন হন এবং বিচার না হয়, তবে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়? তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবেই এই হত্যাকাণ্ডে বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রদলের উদ্যোগে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, পাথর নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যা করা একটি সভ্য রাষ্ট্রে অকল্পনীয়। তারা জোর দাবি জানান—এই নৃশংসতার নেপথ্যে যারাই থাকুক, তাদের দলীয় পরিচয় না দেখে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকৃতির সৌন্দর্যে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সৃষ্টি হয় উত্তেজনা ও প্রতিবাদের জোয়ার। বিকেলের দিকে বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আয়োজিত হয় মশাল মিছিল। পাশাপাশি ছাত্রদলও আলাদাভাবে মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়ক পর্যন্ত।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বলেন, দেশে একের পর এক ভয়ংকর অপরাধ ঘটছে, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া ধীরগতির ও পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া নির্মূলের দাবিও তোলেন।

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে আয়োজিত হয় প্রতিবাদ সমাবেশ। একইসঙ্গে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট, মানারাত, মেরিটাইম, নর্দান ইউনিভার্সিটিসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
তারা বলেন, ‘আজ যদি একজন ব্যবসায়ী এইভাবে প্রাণ হারান, কাল তা হতে পারে আমাদের কারো ভাই, বাবা বা বন্ধুর ক্ষেত্রেও।’
বিক্ষোভকারীরা এক কণ্ঠে দাবি তোলেন—এই ঘটনার বিচার যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হয় এবং অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে পালিয়ে না যেতে পারে। পাশাপাশি তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ করা হোক।

 

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সোহাগ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি যেন গোটা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেশব্যাপী এক সচেতনতার বার্তা দিয়েছে। এই বার্তা স্পষ্ট—অপরাধ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মেনে নেওয়া হবে না।

বিভিন্ন জেলার প্রতিবাদ: দেশব্যাপী উত্তাল জনমত

সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে আসে। ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা সোহাগ হত্যার প্রতিবাদ জানায় এবং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তোলে। প্রতিটি জেলাতেই এক অনন্য উত্তেজনা, আবেগ এবং প্রতিরোধের চিত্র ফুটে ওঠে।

চট্টগ্রাম

বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সদরঘাট ও কোতোয়ালি থানার অধীনে একাধিক স্থানে দলটির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন। তারা দাবি করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বক্তারা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে খুনিদের শাস্তির জোর দাবি জানান।

রাজশাহী

রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, যা দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ ছাড়া রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শিক্ষার্থীরা হাতে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে গৌরহাঙ্গা রেলগেট এলাকায় এসে সমাবেশে পরিণত হয়। বক্তারা বলেন, এই হত্যার পেছনে যেই থাকুক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

রংপুর

উত্তরের শহর রংপুরেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র ক্ষোভ। রংপুর জিলা স্কুল থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল বের করে নগরীর প্রধান সড়ক ঘুরে আসে।

একই সময় রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসের ভেতর ও বাইরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তারা বলেন, দেশে আর কোনো মানুষ যেন প্রকাশ্যে এভাবে নিহত না হয়, তার জন্যই সোহাগ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রয়োজন।

মাগুরা

মাগুরা শহরের কেন্দ্রস্থলে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলটি সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ভায়না মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

এ কর্মসূচিতে অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, এ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কুড়িগ্রাম, পিরোজপুর ও টঙ্গী

এই তিন জেলাতেও জনগণের ক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

কুড়িগ্রামে, সর্বস্তরের ছাত্রসমাজ শহরের বিভিন্ন মোড়ে মিছিল করে ও বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেয়। তারা বলেন, খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধটাই মুখ্য—এমন নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

পিরোজপুরে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ছাত্র ও জনতার ব্যানারে মিছিল বের হয়, যা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বক্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদ জানান।

টঙ্গীতে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় যুবশক্তির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। চেরাগআলী এলাকা থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে কলেজগেট এলাকায় এসে মহাসড়ক আটকে প্রতিবাদ জানানো হয়। তারা বলেন, বারবার জনসমক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটছে কিন্তু বিচার হচ্ছে না—এটা জাতির জন্য ভয়ংকর বার্তা।

 

এইসব প্রতিবাদ শুধু একটি হত্যার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং গোটা জাতির ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ, আতঙ্ক এবং ন্যায়ের আহ্বান। এই প্রতিবাদগুলো যেন একটি বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশের মানুষ এখন আর অপরাধ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি মেনে নিতে চায় না।

রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী মহলের প্রতিক্রিয়া

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতার বহিঃপ্রকাশ। দখলবাজির রাজনীতির পরিণতি হিসেবে এসব বর্বরতা জন্ম নিচ্ছে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব কাজী মো. মামুনুর রশিদ এক বিবৃতিতে বলেন, এই হত্যাকাণ্ড জাহিলি বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। সরকারের ওপর মানুষের আস্থা নেই।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা আশরাফুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

জাতীয় সংস্কার জোটের নেতা মো. আবদুর রহিম বলেন, এই হত্যাকাণ্ড শুধুই একটি ব্যক্তিকে হত্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চুরমার করেছে।

সরকারের অবস্থান পদক্ষেপ

আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি জানান, সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও আশ্বাস দেন, কেউ ছাড় পাবে না। অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হবেই।

র‌্যাব ডিজি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, অপরাধী কোন দলের সেটি বিবেচ্য নয়, অপরাধী মানেই অপরাধী। পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ও পুলিশ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।

সোহাগ হত্যাকাণ্ড যেন গোটা জাতির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। একদিকে রাজপথে প্রতিবাদ, অন্যদিকে সরকারের বিচারের আশ্বাস—এই দ্বৈত প্রবাহের মাঝে জনসাধারণ এখন চায়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে যেন এমন বর্বরতা আর না ঘটে। এ বিচার শুধু সোহাগের জন্য নয়, এ বিচার চাই জাতীয় নিরাপত্তা ও ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য।