সময়: শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলে নেতানিয়াহু সরকারের পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আওয়াজ, গাজা যুদ্ধ নিয়ে চরম সমালোচনা

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:২৫:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
  • / ১৫৮ Time View

image 204389 1752400808

image 204389 1752400808
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির পার্লামেন্ট। ছবি : সংগৃহীত

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি পদত্যাগের ডাক দিলেন দেশটির বিরোধী নেতা এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় সদস্য ইয়াইর গোলান। গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তির সম্ভাবনা বারবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে নেতানিয়াহু সরকারই প্রধান অন্তরায়—এমন অভিযোগ তুলে শনিবার (১৩ জুলাই) তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জীবন রক্ষায় এবং দেশকে ভবিষ্যতের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে হলে এই সরকারকে অবিলম্বে বিদায় নিতে হবে।”

গোলানের এই সাহসী মন্তব্য সামনে আসে এমন এক সময়ে, যখন প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছে—গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার সিদ্ধান্ত মূলত ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু, তার অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোট টিকিয়ে রাখতে সচেতনভাবে যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা ব্যাহত করেছেন।

ক্ষমতার লোভে বন্দিদের জীবনকে উপেক্ষা’ – এক্স গোলানের তীব্র ভাষ্য

এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে গোলান লিখেন, এই চুক্তি যারা বাধাগ্রস্ত করছেন, তারা হলেন নেতানিয়াহু তার উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তাদের কাছে সেনা বন্দিদের জীবন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ নিজেদের মন্ত্রিত্ব ক্ষমতার চেয়ার।”

তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু, স্মোত্রিচ বেন গাভির আসলে এক চরমপন্থি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা পুরো দেশকে এক নির্মম নরকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বারবার শান্তির পথ রুদ্ধ করে কৌশলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খেলায় ব্যস্ত।”

রাজপথে জনগণের ক্ষোভ: যুদ্ধবিরতির দাবিতে বিক্ষোভ তীব্রতর

নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং জনমনে চাপা ক্ষোভ এখন রাজপথে বিস্ফোরিত হচ্ছে। শনিবার রাতে ইসরায়েলের রাজধানী তেল

আবিবে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধবিরতি এবং গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা বলেন, “আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনুন। শান্তির পথে ফিরে যান। যুদ্ধ নয়, আমরা মানবতা চাই।”

তেল আবিব, হাইফা, বেয়ার শেভা, জেরুজালেমসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন শহরে নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবি করে প্রতিবাদ হয়েছে। অনেকেই ‘নো মোর ওয়ার’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করে রাজপথে মোমবাতি প্রজ্বালন করেছেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নেতানিয়াহুর কৌশল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু সরকার বর্তমানে চরম রাজনৈতিক চাপ জনরোষের মুখে রয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি একদিকে নিজের ডানপন্থি জোট সঙ্গীদের সন্তুষ্ট রাখছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদের আড়ালে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

তবে এতে দেশের ভেতর ও বাইরের মানবাধিকার সংগঠন, বন্দি পরিবার, এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরাও এখন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন ও ইয়াইর গোলানের তীব্র সমালোচনার পর ইসরায়েলি রাজনীতিতে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বন্দি বিনিময় ও যুদ্ধবিরতির পথ সত্যিই নেতানিয়াহুর কারণে রুদ্ধ হয়ে থাকে, তবে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিকভাবেও তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

গাজা যুদ্ধ যখন একাধিকবার সহিংসতা, মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তখন দেশটির ভেতর থেকে শান্তির দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসতে পারে।

 

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, নিউইয়র্ক টাইমস, এক্স পোস্ট বিশ্লেষণ

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ইসরায়েলে নেতানিয়াহু সরকারের পদত্যাগের দাবিতে জোরালো আওয়াজ, গাজা যুদ্ধ নিয়ে চরম সমালোচনা

Update Time : ০৬:২৫:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
image 204389 1752400808
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির পার্লামেন্ট। ছবি : সংগৃহীত

 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি পদত্যাগের ডাক দিলেন দেশটির বিরোধী নেতা এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় সদস্য ইয়াইর গোলান। গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তির সম্ভাবনা বারবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে নেতানিয়াহু সরকারই প্রধান অন্তরায়—এমন অভিযোগ তুলে শনিবার (১৩ জুলাই) তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জীবন রক্ষায় এবং দেশকে ভবিষ্যতের ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে হলে এই সরকারকে অবিলম্বে বিদায় নিতে হবে।”

গোলানের এই সাহসী মন্তব্য সামনে আসে এমন এক সময়ে, যখন প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছে—গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার সিদ্ধান্ত মূলত ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু, তার অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোট টিকিয়ে রাখতে সচেতনভাবে যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা ব্যাহত করেছেন।

ক্ষমতার লোভে বন্দিদের জীবনকে উপেক্ষা’ – এক্স গোলানের তীব্র ভাষ্য

এক্স (সাবেক টুইটার)-এ দেওয়া এক পোস্টে গোলান লিখেন, এই চুক্তি যারা বাধাগ্রস্ত করছেন, তারা হলেন নেতানিয়াহু তার উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রিসভার সদস্যরা। তাদের কাছে সেনা বন্দিদের জীবন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ নিজেদের মন্ত্রিত্ব ক্ষমতার চেয়ার।”

তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু, স্মোত্রিচ বেন গাভির আসলে এক চরমপন্থি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন, যারা পুরো দেশকে এক নির্মম নরকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা বারবার শান্তির পথ রুদ্ধ করে কৌশলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খেলায় ব্যস্ত।”

রাজপথে জনগণের ক্ষোভ: যুদ্ধবিরতির দাবিতে বিক্ষোভ তীব্রতর

নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শুধু রাজনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং জনমনে চাপা ক্ষোভ এখন রাজপথে বিস্ফোরিত হচ্ছে। শনিবার রাতে ইসরায়েলের রাজধানী তেল

আবিবে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধবিরতি এবং গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির দাবিতে তীব্র বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীরা বলেন, “আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনুন। শান্তির পথে ফিরে যান। যুদ্ধ নয়, আমরা মানবতা চাই।”

তেল আবিব, হাইফা, বেয়ার শেভা, জেরুজালেমসহ দেশব্যাপী বিভিন্ন শহরে নেতানিয়াহুর পদত্যাগ দাবি করে প্রতিবাদ হয়েছে। অনেকেই ‘নো মোর ওয়ার’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করে রাজপথে মোমবাতি প্রজ্বালন করেছেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নেতানিয়াহুর কৌশল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু সরকার বর্তমানে চরম রাজনৈতিক চাপ জনরোষের মুখে রয়েছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি একদিকে নিজের ডানপন্থি জোট সঙ্গীদের সন্তুষ্ট রাখছেন, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদের আড়ালে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

তবে এতে দেশের ভেতর ও বাইরের মানবাধিকার সংগঠন, বন্দি পরিবার, এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরাও এখন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।

নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন ও ইয়াইর গোলানের তীব্র সমালোচনার পর ইসরায়েলি রাজনীতিতে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি বন্দি বিনিময় ও যুদ্ধবিরতির পথ সত্যিই নেতানিয়াহুর কারণে রুদ্ধ হয়ে থাকে, তবে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিকভাবেও তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

গাজা যুদ্ধ যখন একাধিকবার সহিংসতা, মানবিক বিপর্যয় এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তখন দেশটির ভেতর থেকে শান্তির দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়ে আসতে পারে।

 

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, নিউইয়র্ক টাইমস, এক্স পোস্ট বিশ্লেষণ