“মৃত্যুই ভালো ছিল, ওরা আমার সবকিছু ভ্যানিশ করে দিয়েছে”: ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার কান্নাভেজা সাক্ষাৎকার
- Update Time : ১১:৫৮:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫
- / ২০০ Time View

বিএনপি নেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা সম্প্রতি এক আবেগঘন টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের দীর্ঘ এক দশকের তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মৃত্যুটাই ভালো ছিল, ওরা আমার সব কিছু ভ্যানিশ করে দিয়েছে। ১০ বছর ধরে আমি এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি।”
এই বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে একজন নারী রাজনীতিবিদ ও পেশাদার আইনজীবীর জীবনে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
কারাবাস ও ‘জঙ্গি’ অপবাদ
ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা জানান, তাকে ১০ মাস ৮ দিন কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বারবার তাকে “ইন্টারন্যাশনাল জঙ্গি” বলে উল্লেখ করতেন, যার ফলে কোনো বিচারক জামিন দিতে সাহস পাননি।
ছয় মাস পর হাইকোর্ট ডিভিশনের এক বেঞ্চ অবশেষে তাকে জামিন মঞ্জুর করে, তবে সেটাও “নারী” হওয়ায় বিশেষ বিবেচনায়। তিনি বলেন, “জাস্টিস সিনহা স্যার শুধু নারী বলে আমাকে জামিন দিয়েছিলেন।”
‘জঙ্গি’ তালিকায় নাম এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লড়াই
শাকিলা ফারজানার নাম জেলা ও নগর পুলিশের তৈরি করা জঙ্গি তালিকায় উঠে এসেছিল। জেলা পুলিশের তৈরি করা ৫৩ জনের একটি তালিকায় তার নাম ছিল, যেখানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘হামজা ব্রিগেড’-এর সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একইভাবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কর্তৃক প্রস্তুত ৫৯ জনের একটি পৃথক তালিকাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এমন তালিকায় একজন রাজনীতিবিদ ও পেশাদার আইনজীবীর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া কেবল প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং সেটি তার পেশাগত সুনাম, সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিজীবনে মারাত্মক ক্ষতি বয়ে এনেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রাজনৈতিক পরিচয় ও পিতার অবদান
ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা। তিনি একদিকে যেমন রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
কিন্তু এই অপবাদ ও কারাবাস তার জীবনে এমন এক দাগ রেখে গেছে, যা এখনও তাকে মানসিকভাবে তাড়িয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন, “১০ বছর ধরে আমি সেটা বয়ে বেড়াচ্ছি। কোনো জায়গায় সুযোগ পাই না, পেশাগতভাবে উঠে দাঁড়াতে পারি না।”
একজন নারীর ভেঙে পড়া আত্মা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি
শাকিলা ফারজানার কথায় ফুটে ওঠে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, বরং একজন নারীর জীবনে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন কিভাবে সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। “ওরা আমার সব কিছু ভ্যানিশ করে দিয়েছে”—এই শব্দগুচ্ছ যেন হাজারো প্রশ্ন তোলে, আমাদের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাজনীতির নিরপেক্ষতা নিয়ে।
সমাপ্তি নয়, প্রশ্নের শুরু
এই সাক্ষাৎকার কেবল এক নারীর আর্তনাদ নয়, বরং এটি আমাদের সমাজে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার, দমন-পীড়নের এবং বিচারহীনতার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। একজন আইনজীবী, একজন রাজনৈতিক নেত্রী এবং সর্বোপরি একজন মানুষের জীবন কীভাবে ‘জঙ্গি’ অপবাদের বোঝা টেনে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, শাকিলা ফারজানার জীবন তার মর্মান্তিক উদাহরণ।
তথ্যসূত্র:
ভিডিও সাক্ষাৎকার: Facebook Reel – ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা
https://www.facebook.com/reel/1805713929980869
@সরকারি নথিপত্র ও জঙ্গি তালিকা: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), জেলা পুলিশ, ও জাতীয় গণমাধ্যম।













