‘তুমি কেন ফুয়েল কেটে দিলে?’: বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ভারতীয় ড্রিমলাইনার বিমানের শেষ মুহূর্তের ভয়ানক কথোপকথন
- Update Time : ০৫:৫৩:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ জুলাই ২০২৫
- / ১৪৭ Time View

ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭০ জনের প্রাণহানির ঘটনায় উঠে এসেছে নতুন তথ্য। আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানটি গত ১২ জুন উড্ডয়নের অল্প সময়ের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়। ঘটনার প্রায় এক মাস পর ভারতের এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) শনিবার এক প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিমানের জ্বালানি সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো অংশটি ছিল ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং থেকে পাওয়া পাইলটদের শেষ কথোপকথন। সেখানে একজন পাইলট বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কেন ফুয়েল কেটে দিলে?” অপর পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেন, “আমি কিছু করিনি।“ এই সংলাপ কেবল বিভ্রান্তিই নয়, বরং বিমানের নিয়ন্ত্রণে কোনো বড় কারিগরি ত্রুটি বা মানবিক ভুলের ইঙ্গিতও দেয়।
প্রতিবেদন অনুসারে, বিমানটির দুইটি ইঞ্জিনের জ্বালানি কন্ট্রোল সুইচ ‘RUN’ থেকে ‘CUTOFF’ অবস্থায় চলে যায়—এর অর্থ দাঁড়ায় ইঞ্জিনে জ্বালানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। AAIB বলছে, বোয়িং ৭৮৭-এ ব্যবহৃত FADEC (Full Authority Digital Engine Control) সিস্টেম সাধারণত এই ধরনের পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় চালু করার চেষ্টা করে, যদি সুইচ পুনরায় ‘RUN’ অবস্থায় আনা হয়। কিন্তু এখানে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সবকিছু অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এয়ারক্রাফটের Enhanced Airborne Flight Recorder (EAFR) এর তথ্য অনুযায়ী, পাইলটরা ‘RUN’ সুইচ ফেরত আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু খুব দেরি হয়ে গিয়েছিল। বিমানে থাকা Ram Air Turbine (RAT) সিস্টেমও সক্রিয় হয়ে যায়, যা সাধারণত ইঞ্জিন ব্যর্থ হলে বা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ও হাইড্রলিক সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়লে কাজ শুরু করে। এই RAT সিস্টেমের কার্যক্রম কাছাকাছি এয়ারপোর্টের সিসিটিভিতেও ধরা পড়ে।
বিমানটি আকাশে ছিল মাত্র ৩২ সেকেন্ড। উড্ডয়নের সময় থেকেই এর উচ্চতা ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। একপর্যায়ে এটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের সীমানার বাইরে একটি মেডিকেল ছাত্রাবাসের ওপর ভয়ানক বিস্ফোরণসহ ভেঙে পড়ে। এতে বিমানের ২৪২ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র একজন জীবিত থাকেন। ছাত্রাবাসে থাকা আরও প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থীও এই দুর্ঘটনায় নিহত হন।
অভিজ্ঞ পাইলট, তবু নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি
বিমানটির কমান্ডে ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত সাবারওয়াল, যিনি ৮,২০০ ঘণ্টার বেশি উড্ডয়ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন। তাকে সহায়তা করছিলেন ফার্স্ট অফিসার ক্লাইভ কুন্দর, যিনি ১,১০০ ঘণ্টার ফ্লাইং সময় অতিক্রম করেছিলেন। তদন্তে উল্লেখ করা হয়, দুজনই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন এবং উড্ডয়নের আগে যথেষ্ট বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
নাশকতা নয়, তবে বড় প্রশ্ন থেকে যায়
AAIB-এর রিপোর্টে এখনও কোনো ধরনের নাশকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে আরও গভীর তদন্ত চলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন FAA (Federal Aviation Administration) এর আগের একটি সতর্কতায় বোয়িং ৭৩৭ সিরিজের বিমানগুলোতে ফুয়েল সুইচের লকিং ফিচার নিস্ক্রিয় থাকায় হঠাৎ করে CUTOFF-এ চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। যদিও তখন বিষয়টি “ঝুঁকিপূর্ণ নয়” বলেই বিবেচিত হয়েছিল। তবে তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, একই ত্রুটি বোয়িং ৭৮৭ মডেলেও প্রভাব ফেলেছে কিনা।
এছাড়া ফ্লাইটপথে পাখির সংঘর্ষ বা বাইরের কোনো বাধারও কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিমানটি আকাশে ওঠার পরপরই অস্বাভাবিক হারে উচ্চতা হারিয়ে নিচে নেমে আসে, যা টেকনিক্যাল ফেইলিউরের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিমান দুর্ঘটনা বিশ্লেষকরা বলছেন, পাইলটদের কথোপকথন এবং জ্বালানি সুইচের আচমকা পরিবর্তন—এই দুটি বিষয় মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, ঘটনার পেছনে হয় কোনো ভয়াবহ কারিগরি ত্রুটি ছিল, নয়তো মানবিক কোনো ভুল থেকে পুরো ব্যবস্থাপনাই ভেঙে পড়ে। এমনকি এও হতে পারে যে, ককপিট ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল ইউনিটে বিভ্রাট ঘটেছিল, যা ফুয়েল সিস্টেমকে ভুল সংকেত দিয়েছিল।
শেষ কথা
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রাথমিক পর্যায়ের হলেও এটি বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত একটি আধুনিক, উন্নত প্রযুক্তির বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার কীভাবে উড্ডয়নের ৩২ সেকেন্ডের মধ্যে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হলো, তা নিয়ে বিস্তর তদন্ত এখনো বাকি। পরবর্তী চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই হয়তো জানা যাবে, এটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি অদৃশ্য কোনো ব্যর্থতার নির্মম পরিণতি।
সূত্র: NDTV, AAIB, FAA














