বখাটেদের হামলায় খুন হওয়া বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ রাজশাহীর আলফি – সাহস ও সংগ্রামের এক অনন্য দৃষ্টান্ত
- Update Time : ০৮:০৭:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫
- / ১৬০ Time View

রাজশাহীর মেয়ে রাকিয়া আলফি প্রমাণ করলেন—পরিস্থিতি যতই ভয়াবহ হোক না কেন, মনোবল ও সাহস থাকলে কোনো বাধাই জীবনের পথে থামিয়ে দিতে পারে না। বাবাকে হারিয়ে, চোখের সামনে নির্মমভাবে খুন হতে দেখে, বাবার লাশ মর্গে রেখেই পরীক্ষা দিয়েছিলেন এই এসএসসি পরীক্ষার্থী। আর সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তিনি জয়ী হয়েছেন—এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে।
■ বাবাকে হারানোর পরের দিনই পরীক্ষাকেন্দ্রে
২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয় ১০ এপ্রিল থেকে। ঠিক এর ছয় দিন পর, ১৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী শহরের তালাইমারি শহীদ মিনার এলাকায় ঘটে যায় হৃদয়বিদারক ঘটনা। আলফির বাবা আকরাম আলী (৪৫) মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা বখাটেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন হন। তার বড় ভাই ইমাম হাসান অনন্তও ওই হামলায় গুরুতর আহত হন।
এই ঘটনার পরের দিনই ছিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। শোকে স্তব্ধ, কান্নায় ক্লান্ত আলফি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েন। রাতে বাবার মরদেহ মর্গে, আর সকালে বই নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য হন—এই দৃশ্য যেন কল্পনাকেও হার মানায়।
■ ভাঙা মন, অটল মানসিকতা
পরিবারের সদস্যরা জানান, বাবার মৃত্যুর পরের দিন সকালে আলফি আর পরীক্ষা দিতে চাইছিল না। সারারাত কেঁদেছে, কিছুই খেতে পারেনি। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে, মানসিকভাবে সাহস জুগিয়ে তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় অংশ নিলেও, চোখে ছিল জল আর মনে ছিল বাবাকে হারানোর শোক।
তার চাচা আশরাফুজ্জামান সোহাগ বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম ও জিপিএ-৫ পাবে। কিন্তু এমন এক রাতে বাবা হারালে স্বাভাবিক ফলাফল আশা করাও কঠিন। তবু ও পাস করেছে, এটাই বড় সাফল্য। আমাদের গর্ব হচ্ছে।”
■ শিক্ষকের চোখে আলফি
রাজশাহী নগরীর অগ্রণী বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী আলফি নিয়মিত পড়ালেখায় মনোযোগী ও মেধাবী ছিল। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আলফি আমাদের অন্যতম ভালো ছাত্রী ছিল। এমন বিপর্যয়ের মধ্যেও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ও উত্তীর্ণ হওয়া সত্যিই সাহসিকতার ব্যাপার। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।”
■ আকরাম আলী হত্যাকাণ্ড: প্রতিক্রিয়া ও মামলা
আলফির বাবা আকরাম আলী পেশায় একজন বাসচালক ছিলেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি তালাইমারি এলাকায় মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা বখাটেদের বাধা দিলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর হামলা চালায়। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। হামলার সময় আলফির বড় ভাই অনন্তও আহত হন।
এ ঘটনায় নিহত আকরামের ছেলে ইমাম হাসান অনন্ত বাদী হয়ে বোয়ালিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
■ সমাজের জন্য এক কঠিন বার্তা
এই ঘটনা শুধুই একটি পারিবারিক শোকের বিষয় নয়; এটি আমাদের সমাজের নারী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং বিচার ব্যবস্থার একটি কঠিন প্রতিচ্ছবি। একজন পিতা তার মেয়েকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন, আর সেই মেয়ে বাবার লাশ রেখে পরীক্ষা দিয়েছে। এটা কেবল সাহসিকতা নয়, আমাদের সমাজব্যবস্থার মুখে এক তীব্র প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
■ আলফির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা
এখন অনেকেই চাইছেন, আলফির পাশে দাঁড়াক সরকার ও সমাজ। তাকে যেন উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া হয়, যাতে সে তার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে এবং জীবনে সফল হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যেই আলফির সাহসিকতা ও সাফল্য নিয়ে প্রশংসার বন্যা বইছে।
রাকিয়া আলফির গল্প কোনো কাল্পনিক উপন্যাস নয়—এটি বাস্তব জীবনের কঠিনতম অধ্যায় পেরিয়ে উঠে আসা এক তরুণীর সাহস, শক্তি আর সংগ্রামের গল্প। আমাদের সমাজে এমন সাহসী মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: জনকণ্ঠ রাজশাহী সংবাদদাতা, শিক্ষা বোর্ড তথ্য, স্থানীয় গণমাধ্যম













