সোনার দেশ বাংলাদেশ: স্বাধীনতার পরে কী পেল এ দেশের মানুষ?
- Update Time : ১১:৩৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫
- / ১৮৫ Time View

বাংলাদেশ—এক সোনার দেশ, সবুজে ঘেরা এক স্বপ্নভূমি। নদীমাতৃক এই দেশে অপার প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি ও পরিশ্রমী জনগণ থাকলেও আজও এই দেশের মানুষ বঞ্চিত, বেকার, নির্যাতিত। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতি এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। কারণ একটাই—রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দ দেশ ও জনগণের কথা ভাবার বদলে বারবার নিজেদের স্বার্থ, ক্ষমতা ও দুর্নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
স্বাধীনতা লাভের পর কতদল এসেছে, কিন্তু কেউই সোনার দেশ গড়তে পারেনি
১৯৭১ সালে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল গণমানুষের স্বপ্ন নিয়ে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে একটি আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গড়ার জন্য। কিন্তু আজ আমরা দেখি, ক্ষমতায় যেই এসেছে, সেই নিজের দল ও গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার উপেক্ষিত থেকেছে, আর্থিক বৈষম্য বেড়েছে। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয়েছে ক্ষমতাসীনদের জীবনযাপন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত
দেশের ব্যাংকিং খাত এক সময় ছিল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু এখন এই খাত চলছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় লুটপাট আর ঋণখেলাপিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়ে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে—কেউ পরিশোধ করেনি, আবারো নতুন করে ঋণ পেয়েছে। আর সেই টাকাগুলো দেশে খাটানো হয়নি, বরং বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। শুধু ঋণ নয়, রাজনৈতিকভাবে নিয়োজিত কিছু সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিদেশে বিলাসবহুল বাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেশের অর্থ সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ডসহ নানা দেশে পাচার করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বড় অংশ আজ ধুঁকছে খেলাপি ঋণ আর অর্থপাচারজনিত ক্ষত নিয়ে। কেউ কোনো জবাবদিহিতা চায় না, বরং যেই প্রশ্ন তোলে, তাকেই রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা দেওয়া হয়।
জনগণের কর্মসংস্থান নিয়ে কেউ ভাবেনি
দেশে লক্ষ লক্ষ তরুণ আজ বেকার। তারা ভালো ডিগ্রি নিয়েও রিকশা চালায়, বিদেশে পাড়ি দেয় নির্মাণ শ্রমিক হতে। অথচ এই দেশের নেতারা, যদি সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হতেন, তাহলে দেশের ভিতরেই শিল্প কারখানা গড়ে তুলতেন। বাংলাদেশে সস্তা শ্রম আছে, তরুণ শক্তি আছে, কাঁচামাল আছে—শুধু অভাব আছে নেতৃত্বের সদিচ্ছার।
চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া—এই দেশগুলোও এক সময় দরিদ্র ছিল। কিন্তু তারা নিজেদের জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তুলেছে, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, রপ্তানি বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। আজ তারা বিশ্বের শ্রদ্ধার আসনে।
বাংলাদেশেও একই পথ অনুসরণ করা যেত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, হাইটেক পার্ক, কৃষিভিত্তিক শিল্পের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের নেতারা এ পথে হাঁটেননি। তারা বরং চীন, জাপান বা মালয়েশিয়ার উন্নয়ন মডেলকে মুখে স্বীকার করলেও বাস্তবে নিজেরা কেবল বিলাসবহুল জীবনযাপন ও বিদেশে সম্পদ সঞ্চয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।
কেনো এমন হচ্ছে? কোথায় ব্যর্থতা?
এর প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। গণতন্ত্রের নামে চলছে প্রহসন, নির্বাচন নিয়ে চলছে নাটক, প্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে যখন দলীয় আনুগত্যই একমাত্র যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন দক্ষতা, সততা ও জনগণের কল্যাণ বিসর্জন পায়।
নেতারা যদি সত্যিই দেশের উন্নয়ন চাইতেন, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠত। তেল-গ্যাস, কয়লা, কৃষিপণ্যসহ দেশের সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের ভেতরেই আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা যেত। কিন্তু এরা বরং বিদেশি পণ্য আমদানিতে মুনাফা খোঁজেন, যেন কমিশন পান।
করণীয় কী?
বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়তে হলে এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি সাহসী, দেশপ্রেমিক ও জনমুখী রূপান্তরের। রাজনৈতিক গোঁজামিল, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আর্থিক দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নিচের প্রতিটি পয়েন্টকে বাস্তব ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে:
১. সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা
একটি রাষ্ট্র তখনই উন্নতির পথে এগোয়, যখন সেখানে সুশাসন নিশ্চিত থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুশাসনের চরম অভাব রয়েছে—ক্ষমতাসীনরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। এখন দরকার এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য দায়বদ্ধতা থাকবে। সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলা, রাজনৈতিক নেতাদের লুটপাট, অবৈধ কাজ—সবকিছুর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন, শক্তিশালী হিসাবরক্ষণ ও অডিট ব্যবস্থা এবং তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণকে হিসাব চাইবার অধিকার দিতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পের সফলতা, ব্যর্থতা এবং ব্যয়ের জবাব চাইতে হবে প্রশাসনের কাছে।
২. অর্থপাচার রোধ
বছরের পর বছর ধরে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে—কানাডার বেগমপাড়ায়, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে। এসব অর্থ কোনো কল্পনা নয়, এগুলো বাস্তব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট এবং মিডিয়া তদন্তে বারবার উঠে এসেছে দেশের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিদেশে সম্পদ গড়ার কাহিনি। এখন সময় এসেছে এই অর্থ পুনরুদ্ধারের। এর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে, স্বচ্ছ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে, এবং যেসব প্রবাসী সম্পদভোগী নেতা-কর্মকর্তা রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অর্থপাচার বন্ধ না হলে দেশের অর্থনীতি কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।
৩. শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
দেশে বেকার সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক কর্মসংস্থানের জন্য হাহাকার করছে। অথচ শিল্পায়নের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। সরকারকে অবিলম্বে একটি সুসংগঠিত জাতীয় শিল্পনীতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কৃষিভিত্তিক শিল্প, রপ্তানিমুখী উৎপাদন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার রূপরেখা থাকবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, কাঁচামাল সরবরাহ এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিয়ে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে হবে। চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো আজ বিশ্ববাজারে আধিপত্য করছে তাদের বিশাল শিল্প খাতের কারণে। বাংলাদেশও পারবে, যদি সরকার দৃঢ় মনোবল নিয়ে শিল্পখাতে বিনিয়োগ করে।
৪. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
দেশে দুর্নীতি এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। অফিসে ফাইল নড়াতে ঘুষ, প্রকল্পে বাজেট বাড়াতে কমিশন, নিয়োগে উৎকোচ—সবই আজ চেনা বাস্তবতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে কেবল কথায় নয়, কাজে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। কোন দল, কোন মত—তা দেখা যাবে না। দুর্নীতিবাজ যেই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ আদালত গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কেনাকাটায় ডিজিটাল পদ্ধতি, ই-টেন্ডারিং, সিসিটিভি নজরদারি চালু করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আর যারা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে রাখা যাবে না।
৫. যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন
বাংলাদেশের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ তরুণ—এটাই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু এই তরুণরা যদি দক্ষ না হন, তাহলে তারা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার, আইটি ইনস্টিটিউট, কৃষি ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ফান্ড, স্বল্পসুদে ঋণ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে তরুণদের জন্য। তাহলে তারা আর চাকরির পেছনে ছুটবে না, বরং উদ্যোক্তা হবে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে।
এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই যদি আন্তরিকভাবে কাজ করা হয়, তবে বাংলাদেশ দ্রুতই দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত, কর্মসংস্থানে পরিপূর্ণ এক “সোনার দেশ”-এ পরিণত হতে পারে। দরকার শুধু সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ জাগরণ।
বাংলাদেশ সত্যিই একটি সম্ভাবনার দেশ—এই দেশ সোনার দেশ, সবুজে ঘেরা আমাদের মাতৃভূমি। এখানে পর্যাপ্ত সম্পদ ও মানবসম্পদ রয়েছে, যা সঠিকভাবে কাজে লাগালে বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক নেতারা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ না করে নিজেদের ক্ষমতা, বিত্ত ও বিদেশে সম্পদ গড়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের জাগরণের। দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকেই সকলকে একসাথে দুর্নীতি রুখে দাঁড়াতে হবে, নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। আর না হলে—সোনার বাংলাদেশ শুধু ইতিহাসের বইতেই সোনার দেশ হয়ে থাকবে, বাস্তবে নয়।













