বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্তে ৮৬ বার সময় নিল সিআইডি
- Update Time : ০২:৫৬:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
- / ৩৯৯ Time View

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্তে ৮৬ বার সময় নিল সিআইডি
, ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
আট বছরেও শেষ হয়নি বহুল আলোচিত সাইবার হ্যাকিং মামলার তদন্ত, সিআইডির নিষ্ক্রিয়তায় হতাশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতি—রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে বারবার সময় নেয়ার নজিরবিহীন ঘটনায় তদন্ত সংস্থা সিআইডিকে আগামী ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২ জুলাই) ঢাকা মহানগরের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. জাকির হোসেন এ নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান একাধিকবার সময় নিয়েও প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত এবার কড়া বার্তা দেয়।
৮৬ বার সময় প্রার্থনা—নতুন এক রেকর্ড
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ১০১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সিআইডি এ পর্যন্ত ৮৬ বার সময় প্রার্থনা করেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো আর্থিক জালিয়াতির মামলায় সময় নেয়ার এক রেকর্ড।
এ ঘটনায় আর্থিক ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতি ও সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসীনতায় মামলাটি আজও নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি।
রিজার্ভ চুরির নেপথ্য
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করা হয়। এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (RCBC)-এর বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে অর্থের সিংহভাগ চলে যায় ম্যানিলা ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন ক্যাসিনোতে, যেখানে তা সহজেই ধোঁয়াশা বা ‘মানি লন্ডারিং’-এর ফাঁদে পড়ে যায়।
বাকী ২০ মিলিয়ন ডলারের একটি অংশ শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর চেষ্টা হলেও বানানজনিত ত্রুটির কারণে তা আটকানো সম্ভব হয়।
style="text-align: justify;">তদন্তে ধীরগতি ও হতাশা
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন থাকলেও সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও সাইবার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
আইনজীবী ও বিচার বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় একটি রাষ্ট্রীয় অর্থ জালিয়াতি নিয়ে বছরের পর বছর তদন্ত ঝুলে থাকা দেশের বিচারব্যবস্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আদালতের কঠোর বার্তা
বিচারক মো. জাকির হোসেন তার আদেশে বলেন, “বারবার সময় নেয়ার বিষয়টি তদন্ত সংস্থার দায় এড়াতে পারে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা যদি আট বছরেও তদন্ত প্রতিবেদন দিতে না পারে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন, “সিআইডিকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। ব্যর্থ হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও চ্যালেঞ্জ
রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও বহুক্ষেত্রে চিঠি চালাচালি ও আইনি প্রক্রিয়ায় গতি ছিল ধীর। ফিলিপাইনে দায়ের করা মামলাগুলোর অগ্রগতিও অত্যন্ত ধীরগতি।
বিশ্বব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় নিউইয়র্কের আদালতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিক সিভিল মামলা চলমান রয়েছে, যার ফলাফলের উপর ক্ষতিপূরণের সম্ভাবনা নির্ভর করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা শুধুই একটি অর্থনৈতিক দুর্নীতি নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। আট বছর পার হলেও এই মামলার তদন্ত এখনও অনিশ্চিত এবং তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। সিআইডির হাতে থাকা সময় আর বেশি নেই—২৪ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের কার্যকর, নির্ভুল এবং স্বচ্ছ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে, নতুবা এই দেরি দেশের ভাবমূর্তি ও জনগণের আস্থার ওপর চরম আঘাত হানবে।













