বাংলাদেশ—সোনার দেশ: দুর্নীতিই বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা
- Update Time : ০৩:১২:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫
- / ৩৬৬ Time View

বাংলাদেশকে আমরা ভালোবাসার ভাষায় বলি—”সোনার বাংলা”। আমাদের এই দেশ প্রকৃতি, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। আছে উর্বর কৃষিজমি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নদীব্যবস্থা, সমুদ্রবন্দর, গার্মেন্টস শিল্প, প্রবাসী আয়, তরুণ জনসংখ্যা এবং তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না? এর একমাত্র উত্তর—দুর্নীতি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (TI)-এর ২০২৩ সালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স (CPI) অনুযায়ী, বাংলাদেশ দুর্নীতির দিক থেকে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৭তম অবস্থানে রয়েছে। এটি একটি গভীর উদ্বেগজনক চিত্র—যেখানে উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত দুর্নীতির করাল গ্রাসে পড়ে যাচ্ছে।
রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি: সবচেয়ে গভীর শিকড়
বাংলাদেশের দুর্নীতির প্রধান উৎস হিসেবে যেটি প্রতিনিয়ত আলোচনায় আসে, তা হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের অশুভ আঁতাত। বহুজন বিশ্বাস করেন, দুর্নীতির মূল ঘাঁটি তৈরি হয় রাজনীতি থেকে। রাজনীতিকরা নির্বাচনের সময় উন্নয়নের কথা বললেও, ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, দলীয় নিয়োগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব দুর্নীতির দৃষ্টান্ত প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠেছে।
একইভাবে প্রশাসনের একাংশ রাজনীতির ছায়ায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান এক আলোচনায় বলেছিলেন, “ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রশাসনকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে” (সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার,)।
বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বারবার প্রশ্ন উঠছে। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বিচারের সম্মুখীনই হন না, আর বিচার শুরু হলেও রাজনৈতিক চাপ, সাক্ষী-প্রভাব, বা আইনি জটিলতায় বিচার শেষ হয় না। হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী একবার বলেন, “আইনের চোখে সবাই সমান, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় কিছু মানুষ আইনের ঊর্ধ্বে।” (সূত্র: বিবিসি বাংলা)
এ বাস্তবতায় দুর্নীতিবাজদের শাস্তির অভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থাহীনতা ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।
আর্থিক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতও এখন দুর্নীতির শিকারে। বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারি, চেক জালিয়াতি, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অর্থ লোপাট হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে ঋণ খেলাপিদের সুযোগ করে দেওয়া, সরকারি ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ নেওয়া এবং তা ফেরত না দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
২০১৮ সালে অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছিলেন, “ব্যাংকিং খাতে ২২ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিশ্চিত”। বর্তমান সময়ে সে পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে দুর্নীতির বিস্তার
বাংলাদেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বড় বাজেট বরাদ্দ হলেও, বাস্তবে তা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। সরকারি হাসপাতাল থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রকল্প—সবখানেই দালালচক্র, ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২০ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে দেখা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও তা যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি।
দুর্নীতির ভয়াবহ প্রভাব
- দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগে আস্থার অভাব
- উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও দেরি
- মানবসম্পদের অপচয়
- সাধারণ জনগণের ভোগান্তি ও হতাশা
- ন্যায়বিচার না পাওয়ার সংস্কৃতি
করণীয় ও আশার আলো
বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রাথমিকভাবে যেটা প্রয়োজন, তা হলো—রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা।
এ ছাড়া নিচের কিছু পদক্ষেপ অপরিহার্য:
- দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক ও আমলাদের শাস্তি নিশ্চিত করা
- দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন কমিশন গঠন
- দুর্নীতির মামলায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল’ চালু করা
- নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ
- প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কার (ই-গভর্ন্যান্স)
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছে—তবে এই উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিচ্ছে একটাই অভিশাপ—দুর্নীতি। যদি আমরা এই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারি, তাহলে সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমাদের সন্তানদের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই সময়—প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার।
তথ্যসূত্র:
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, ২০২৩
- নিউইয়র্ক টাইমস
- দ্য ডেইলি স্টার
- বিবিসি বাংলা
- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বার্ষিক প্রতিবেদন,
লেখক পরিচিতি:
বিল্লাল হোসেন একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার, কলাম লেখক ও “23 years as a Banker” গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি দুর্নীতিবিরোধী জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের পক্ষে লিখে থাকেন।













