সময়: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণভবনে টিউলিপের প্রচারপত্র, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধের নোট নিয়ে তোলপাড়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ০৬:৩৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫
  • / ১৪৮ Time View

ac664fd2d950ee4b5ff8ceb9d99325ce 6784ee7227aec 1

বামপাশে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর গণভবনে লুটপাটের জিনিস খুঁজছে মানুষ। ডানপাশে, সেখানে মিললো টিউলিপের প্রচারপত্র। ছবি: রয়টার্স, সানডে টাইমস

ঢাকা, বাংলাদেশ
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর গণভবনে ঘটে যাওয়া লুটপাট ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গণভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের প্রচারপত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত নথি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় টিউলিপের ভূমিকা ও হাসিনা সরকারের দুর্নীতির যোগসূত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গণভবনের ধ্বংসাবশেষে টিউলিপের প্রচারপত্র

ব্রিটেনের লেবার পার্টির মন্ত্রী এবং অর্থবিষয়ক সেক্রেটারি টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছেন।

গত শনিবার ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকা গণভবনে প্রবেশের অনুমতি পায় এবং সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে। ধুলোমাখা গণভবনের একটি সিঁড়ির ওপর থেকে পাওয়া যায় টিউলিপ সিদ্দিকের ধন্যবাদপত্র ও তার ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন। ধন্যবাদপত্রটি তিনি স্থানীয় লেবার পার্টি সদস্যদের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

বার্ষিক প্রতিবেদনে টিউলিপ জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে থাকা নাগরিকদের সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই নথি পাওয়া যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে— কেন হাসিনার সরকারি বাসভবনে টিউলিপের ব্যক্তিগত কাগজপত্র রাখা হয়েছিল?

আলোচিত ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের আইনি পরামর্শ

গণভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটও পাওয়া গেছে, যেখানে বিশিষ্ট এক ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের আইনি পরামর্শ ছিল। নোটে উল্লেখ ছিল, একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রকাশনা বন্ধ করার কৌশল নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হাসিনা সরকারের সমালোচনামূলক কোনো প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রণীত হয়েছিল।

নোটের পাশেই বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন ফরম পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই নথিগুলো প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার বিদেশে অর্থ পাচার ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন।

টিউলিপের সম্পদের বিতর্ক পদত্যাগের দাবি

টিউলিপ সিদ্দিক এর আগে একাধিকবার তার খালার শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি দাবি করেন যে, তার খালা শেখ হাসিনার সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় তার এই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে একাধিক ফ্ল্যাট কেনা ও হাসিনার ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে এসব ফ্ল্যাট প্রাপ্তির অভিযোগে টিউলিপের নাম যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টিউলিপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কঠিন করে তুলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গণভবণে টিউলিপের একটি ফ্লায়ার পাওয়া গেছে। ছবি: রয়টার্স, সানডে টাইমস।

জনরোষ গণভবনে লুটপাট

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বিক্ষুব্ধ জনতা গত বছরের আগস্টে গণভবনে হামলা চালায়। তারা বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়, যার মধ্যে ছিল অর্থ, গয়না, ফার্নিচার এবং খাদ্যদ্রব্য। এখনো সেখানে ধ্বংসাবশেষ ও ধুলাবালি ছড়িয়ে আছে।

গণভবনে ১৮ একরের বাগান, একটি লেক এবং অসংখ্য কক্ষ রয়েছে। সেই লেকেই হাসিনা মাছ ধরতেন বলে জানা যায়। তবে এখন গণভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে এবং সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরনের নথি ও সামগ্রী।

টিউলিপের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ

এ ঘটনার পর টিউলিপ সিদ্দিক এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার অবস্থান এখন চাপের মুখে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার পতন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে গণভবনে পাওয়া এসব নথি দেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

গণভবনে টিউলিপের প্রচারপত্র, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধের নোট নিয়ে তোলপাড়

Update Time : ০৬:৩৮:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৫
বামপাশে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর গণভবনে লুটপাটের জিনিস খুঁজছে মানুষ। ডানপাশে, সেখানে মিললো টিউলিপের প্রচারপত্র। ছবি: রয়টার্স, সানডে টাইমস

ঢাকা, বাংলাদেশ
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর গণভবনে ঘটে যাওয়া লুটপাট ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। গণভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের প্রচারপত্র ও অন্যান্য ব্যক্তিগত নথি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় টিউলিপের ভূমিকা ও হাসিনা সরকারের দুর্নীতির যোগসূত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গণভবনের ধ্বংসাবশেষে টিউলিপের প্রচারপত্র

ব্রিটেনের লেবার পার্টির মন্ত্রী এবং অর্থবিষয়ক সেক্রেটারি টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছেন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছেন।

গত শনিবার ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকা গণভবনে প্রবেশের অনুমতি পায় এবং সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে। ধুলোমাখা গণভবনের একটি সিঁড়ির ওপর থেকে পাওয়া যায় টিউলিপ সিদ্দিকের ধন্যবাদপত্র ও তার ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন। ধন্যবাদপত্রটি তিনি স্থানীয় লেবার পার্টি সদস্যদের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।

বার্ষিক প্রতিবেদনে টিউলিপ জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটে থাকা নাগরিকদের সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই নথি পাওয়া যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে— কেন হাসিনার সরকারি বাসভবনে টিউলিপের ব্যক্তিগত কাগজপত্র রাখা হয়েছিল?

আলোচিত ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের আইনি পরামর্শ

গণভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটও পাওয়া গেছে, যেখানে বিশিষ্ট এক ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের আইনি পরামর্শ ছিল। নোটে উল্লেখ ছিল, একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রকাশনা বন্ধ করার কৌশল নিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি হাসিনা সরকারের সমালোচনামূলক কোনো প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রণীত হয়েছিল।

নোটের পাশেই বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন ফরম পাওয়া যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই নথিগুলো প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার বিদেশে অর্থ পাচার ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন।

টিউলিপের সম্পদের বিতর্ক পদত্যাগের দাবি

টিউলিপ সিদ্দিক এর আগে একাধিকবার তার খালার শাসনব্যবস্থা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ২০১৭ সালে তিনি দাবি করেন যে, তার খালা শেখ হাসিনার সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় তার এই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে একাধিক ফ্ল্যাট কেনা ও হাসিনার ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে এসব ফ্ল্যাট প্রাপ্তির অভিযোগে টিউলিপের নাম যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টিউলিপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কঠিন করে তুলছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে তার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গণভবণে টিউলিপের একটি ফ্লায়ার পাওয়া গেছে। ছবি: রয়টার্স, সানডে টাইমস।

জনরোষ গণভবনে লুটপাট

শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর বিক্ষুব্ধ জনতা গত বছরের আগস্টে গণভবনে হামলা চালায়। তারা বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়, যার মধ্যে ছিল অর্থ, গয়না, ফার্নিচার এবং খাদ্যদ্রব্য। এখনো সেখানে ধ্বংসাবশেষ ও ধুলাবালি ছড়িয়ে আছে।

গণভবনে ১৮ একরের বাগান, একটি লেক এবং অসংখ্য কক্ষ রয়েছে। সেই লেকেই হাসিনা মাছ ধরতেন বলে জানা যায়। তবে এখন গণভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে এবং সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরনের নথি ও সামগ্রী।

টিউলিপের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যৎ

এ ঘটনার পর টিউলিপ সিদ্দিক এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তার অবস্থান এখন চাপের মুখে পড়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার পতন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে গণভবনে পাওয়া এসব নথি দেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে।