র্যাব বিলুপ্তি ও পুলিশ সংস্কারের প্রস্তাব: বিএনপির সুপারিশমালা
- Update Time : ০৬:৫৪:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২৪
- / ২০৫ Time View

বিএনপি পুলিশ বাহিনীকে মানবিক ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘পুলিশ কমিশন’ গঠন এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির সুপারিশ। দলটির মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পুলিশ বিভাগের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অসংগতি দূর হবে এবং জনগণের সেবার মান উন্নত হবে।
আজ মঙ্গলবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিটির প্রধান হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
পুলিশ সংস্কারের প্রস্তাবনা: জনবান্ধব ও সেবামূলক দৃষ্টি
সংবাদ সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্র বা সমাজ কল্পনা করা যায় না। তবে এটি নিশ্চিত করা জরুরি যে পুলিশ জনগণের প্রভু নয়, বরং সেবক। আমরা পুলিশের মধ্যে এ ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে বিভিন্ন সুপারিশ করেছি।”
বিএনপির মতে, বর্তমান সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে। পুলিশের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণমূলক ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব: নৈতিক ও কার্যকর সমাধানের দাবি
বিএনপি র্যাবকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে। দলটির মতে, র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এতটাই গুরুতর যে এটি একটি ‘দানবে’ পরিণত হয়েছে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা থেকে উত্তরণে একে বিলুপ্ত করা ছাড়া বিকল্প নেই। মেডিকেল সায়েন্সেও দেখা যায়, যখন গ্যাংগ্রিন হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। এই বাহিনী বিলুপ্ত হলে জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।”
তিনি আরও বলেন, র্যাবের দায়িত্ব থানা-পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে পুনর্বণ্টন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশন ও স্থানীয় নাগরিক কমিটির প্রস্তাব
বিএনপি পুলিশ বাহিনীকে আরও জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত করতে নিচের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছে:
পুলিশ কমিশন গঠন
- গঠন ও কার্যক্রম:
- কমিশনের চেয়ারম্যান থাকবেন সংসদীয় কমিটির প্রধান (সংসদ বিদ্যমান থাকলে) অথবা সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক।
- আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এবং বিশিষ্ট নাগরিকসহ আটজন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করা হবে।
- পুলিশের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন কাজ করবে।
স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক কমিটি
- প্রতিটি উপজেলায় একটি নাগরিক কমিটি গঠন করা হবে।
- কমিটি পুলিশের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করবে।
- কমিটিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইউপি সদস্য, শিক্ষক, এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কমিউনিটি পুলিশিং: জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ
বিএনপির সুপারিশমালায় কমিউনিটি পুলিশিংকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- উদ্যোগের কাঠামো:
- প্রতিটি ইউনিয়নে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব।
- স্থানীয় জনগণের সঙ্গে একত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবেন এই কমিউনিটি পুলিশ কর্মকর্তা।
- সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, এবং সামাজিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সমন্বয় করবেন।
- কমিউনিটি পুলিশিংয়ের আর্থিক ব্যয় বহন করবে স্থানীয় সরকার।
সংস্কার বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য
বিএনপি মনে করে, প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে—
- পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
- মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কমবে।
- একটি মানবিক ও কার্যকর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গড়ে উঠবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাবেক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের সদস্যরা বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবের প্রশংসা করেছেন।
৫ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের কাছে বিএনপি তাদের এই সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। দলটি আশা করে, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি উন্নততর এবং মানবিক পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।











