জুনেই পে-স্কেলের গেজেট,সাধারণ জনগণের ভবিষ্যৎ কোথায়?
- Update Time : ১১:৪১:২৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
- / ৪৭ Time View

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনা দেশের লাখো সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীর মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, যারা সরকারি চাকরিজীবী নন, তাদের জন্য এই পে-স্কেলের প্রভাব কী হবে?
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা খুবই সীমিত। অন্যদিকে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবী, দিনমজুর, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর অংশ। তাদের আয়ের সঙ্গে সরকারি পে-স্কেলের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু বাজারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, দেশে যখনই সরকারি বেতন বৃদ্ধি পায়, তখন অনেক অসাধু ব্যবসায়ী সেটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে। বাসাভাড়া, পরিবহন ব্যয়, শিক্ষাখরচ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সরকারি কর্মচারীরা কিছুটা বেতন বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ জনগণের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ২০ বা ৩০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় করেন, তবে তিনি হয়তো সেই চাপ সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু একজন গার্মেন্টস কর্মী, দোকান কর্মচারী, রিকশাচালক, কৃষক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্ন আয়ের কর্মচারীর বেতন তো একই থাকবে। তাদের জন্য চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস কিংবা বাসাভাড়ার অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি জীবনমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অর্থনীতিবিদরা সাধারণত বলেন, বেতন বৃদ্ধি তখনই ইতিবাচক ফল দেয় যখন উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং বাজার সরবরাহও একই সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। অন্যথায় বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহ মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যদি বাজার তদারকি দুর্বল হয় এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক বৈষম্য। সরকারি চাকরিজীবীরা যদি কয়েক ধাপে উল্লেখযোগ্য বেতন বৃদ্ধি পান, অথচ বেসরকারি খাতের কর্মচারীদের আয় অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে আয় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এতে সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্যও কার্যকর নীতি গ্রহণ করা।
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের স্বার্থও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি নতুন পে-স্কেলের সুফল একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এর খেসারত পুরো জাতিকে মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে দিতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন হবে অসম ও ভারসাম্যহীন।
অতএব, নবম পে-স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, বাজারব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বিষয়। তাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা, যাতে সরকারি কর্মচারীরা ন্যায্য সুবিধা পান এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপের শিকার না হন।













