যুক্তরাষ্ট্রের ইরান দখলের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিলো কুর্দি যোদ্ধারা
- Update Time : ০৫:৪১:৪০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
- / ১২৬ Time View

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন কিংবা দেশটি দখলের যে কল্পনা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে তা বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে আঘাত খেয়ে ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে কুর্দি যোদ্ধাদের সুস্পষ্ট অবস্থান এই পরিকল্পনাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
ইরানে হামলা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা ছিল, দ্রুত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতের মাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা এবং শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তাদের হিসাব ছিল, এতে দেশের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়বে। সেই সুযোগে সরকার পতন ঘটানো সহজ হবে—এমনটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চললেও ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো বা শাসনব্যবস্থায় কোনো ভাঙন দেখা যায়নি। বরং দেশটির প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের মতোই শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রত্যাশামতো সফল হয়নি।
পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় পরবর্তী ধাপে স্থলপথে হামলার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হয়। কিন্তু ইরানের বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরাসরি মার্কিন সেনা অভিযানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ফলে বিকল্প হিসেবে অন্যের মাধ্যমে সংঘাত পরিচালনার পরিকল্পনা সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত কুর্দি যোদ্ধাদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তাদের ব্যবহার করে সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টি করা গেলে তা ধীরে ধীরে ইরানের ভেতরে ছড়িয়ে পড়বে এবং শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করবে।
এই বিষয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এবং তার প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তি বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কুর্দি বাহিনী ইরানের ভেতরে অভিযান চালাতে পারে এবং এতে পরিবর্তনের পথ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে সেই সম্ভাবনাও এখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যেমন United Kingdom, Canada, Germany এবং France—এসব দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে কুর্দি যোদ্ধাদের পক্ষ থেকে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় অংশ নেবে না। একজন শীর্ষস্থানীয় কুর্দি কমান্ডার জানিয়েছেন, তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং তারা নিজেরাই এখন নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
কুর্দি পেশমারগা বাহিনীর মেজর জেনারেল Sirwan Barzani জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল প্রায় ৪৩০টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। এতে তাদের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং তারা নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত।
উত্তর ইরাকে উগ্র সংগঠন Islamic State-বিরোধী ফ্রন্টলাইনে দায়িত্ব পালন করা বারজানি ২৪ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একই দিনে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পেশমারগা বাহিনীর ৬ সদস্য নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
তিনি এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, “আমরা তো তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করিনি। আমরা প্রতিবেশী। আমাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে। তাহলে প্রতিদিন আমাদের ওপর হামলা চালানোর কারণ কী?”
পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানকে ঘিরে পরিকল্পনা একের পর এক বাধার মুখে পড়ছে। সরাসরি হামলা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না, আন্তর্জাতিক সমর্থন কমে যাচ্ছে, আর যাদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করার চিন্তা করা হয়েছিল, তারাও সেই পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—যেখানে শুধু শক্তি নয়, বরং আঞ্চলিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক অবস্থান এবং বাস্তব পরিস্থিতিই নির্ধারণ করছে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা, যা ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই।
















