সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির নেপথ্যে ইরানের জ্বালানি–খনি দখলের হিসাব?

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১২:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ১৭৩ Time View
চুক্তি সফল না হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ছবি সংগৃহীত

 

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তেহরান–ওয়াশিংটন সম্পর্ক। ইরান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আন্তরিক আলোচনা হলে তারা নতুন করে পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তি এমন হতে হবে যাতে উভয় পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র–এর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, আলোচনা থমকে আছে ইরানের কারণেই। যদিও জানা গেছে, কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় দফা আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েক দশকের বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু হয়।

বুশেহর হলো ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

 

তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতির বার্তাও স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। বার্তাসংস্থা Reuters–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও নিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। হাজার হাজার সেনা মোতায়েন এবং অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ানোর খবর পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাতিস্লাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেন, তবে সব পথ যে সফল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। রুবিওর দাবি, অতীতে তেহরানের সঙ্গে টেকসই কোনো চুক্তি সফল হয়নি—তবু চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানও পাল্টা কড়া বার্তা দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো হামলাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। উত্তেজনার এই ভাষা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও সংঘাতের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ—নতুন সমঝোতার চাবিকাঠি?

ইরানের আধা সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি–এর বরাতে দেশটির এক কূটনীতিক জানান, নতুন চুক্তি টেকসই করতে হলে এমন খাত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ, খনি সম্পদ উন্নয়ন, এমনকি উড়োজাহাজ ক্রয়—এসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি, অর্থাৎ Joint Comprehensive Plan of Action (জেসিপিওএ), ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তেহরানের মতে, আগের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারেনি—এ কারণেই তা টেকেনি।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে: বর্তমান উত্তেজনার পেছনে কি কেবল নিরাপত্তা উদ্বেগ, নাকি ইরানের বিশাল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারও একটি বড় ফ্যাক্টর? ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুদের অধিকারী। পাশাপাশি বিরল খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত খনিসম্পদও দেশটির রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার বড় শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধ না সমঝোতা?

তেহরানে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, “বল এখন আমেরিকার কোর্টে”—তারা আন্তরিক হলে সমঝোতা সম্ভব। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ভাষ্য—ইরানকে বিশ্বাস করা কঠিন। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল কি ‘চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতা’, নাকি আলোচনার আড়ালে শক্তির প্রদর্শন?

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—দুই দেশই সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে চায়, তবে কেউই কৌশলগত অবস্থান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। যদি অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন কোনো বাস্তববাদী সমঝোতা গড়ে ওঠে, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অন্যথায়, মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির নেপথ্যে ইরানের জ্বালানি–খনি দখলের হিসাব?

Update Time : ১২:৫৬:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
চুক্তি সফল না হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ছবি সংগৃহীত

 

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তেহরান–ওয়াশিংটন সম্পর্ক। ইরান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আন্তরিক আলোচনা হলে তারা নতুন করে পারমাণবিক সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরানের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তি এমন হতে হবে যাতে উভয় পক্ষ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র–এর কর্মকর্তারা দাবি করছেন, আলোচনা থমকে আছে ইরানের কারণেই। যদিও জানা গেছে, কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় দফা আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েক দশকের বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু হয়।

বুশেহর হলো ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র

 

তবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতির বার্তাও স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। বার্তাসংস্থা Reuters–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও নিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। হাজার হাজার সেনা মোতায়েন এবং অস্ত্রভাণ্ডার বাড়ানোর খবর পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাতিস্লাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানকেই অগ্রাধিকার দেন, তবে সব পথ যে সফল হবে তার নিশ্চয়তা নেই। রুবিওর দাবি, অতীতে তেহরানের সঙ্গে টেকসই কোনো চুক্তি সফল হয়নি—তবু চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানও পাল্টা কড়া বার্তা দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো হামলাকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। উত্তেজনার এই ভাষা দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও সংঘাতের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

অর্থনৈতিক স্বার্থ—নতুন সমঝোতার চাবিকাঠি?

ইরানের আধা সরকারি বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি–এর বরাতে দেশটির এক কূটনীতিক জানান, নতুন চুক্তি টেকসই করতে হলে এমন খাত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পায়। তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ, খনি সম্পদ উন্নয়ন, এমনকি উড়োজাহাজ ক্রয়—এসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি, অর্থাৎ Joint Comprehensive Plan of Action (জেসিপিওএ), ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খুলে দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তেহরানের মতে, আগের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারেনি—এ কারণেই তা টেকেনি।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে: বর্তমান উত্তেজনার পেছনে কি কেবল নিরাপত্তা উদ্বেগ, নাকি ইরানের বিশাল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারও একটি বড় ফ্যাক্টর? ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের মজুদের অধিকারী। পাশাপাশি বিরল খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত খনিসম্পদও দেশটির রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার বড় শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধ না সমঝোতা?

তেহরানে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, “বল এখন আমেরিকার কোর্টে”—তারা আন্তরিক হলে সমঝোতা সম্ভব। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ভাষ্য—ইরানকে বিশ্বাস করা কঠিন। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল কি ‘চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতা’, নাকি আলোচনার আড়ালে শক্তির প্রদর্শন?

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—দুই দেশই সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে চায়, তবে কেউই কৌশলগত অবস্থান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। যদি অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন কোনো বাস্তববাদী সমঝোতা গড়ে ওঠে, তবে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। অন্যথায়, মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় সংঘাতের মুখে পড়তে পারে।