সামরিক সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র–ইরান বৈঠক, মাস্কাটে শুরু উচ্চপর্যায়ের আলোচনা
- Update Time : ১১:৩৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১১৭ Time View

দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা চরমে ওঠার মধ্যেই আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ওমানের রাজধানী মাস্কাটে দেশ দুটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এই আলোচনায় অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
গত মাসে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকারের সহিংস পদক্ষেপ এবং তার জেরে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার পরই এই সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ওই বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে।
যদিও বৈঠকের স্থান ও আলোচনার পরিধি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে একপর্যায়ে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে উত্তেজনা প্রশমনে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উভয় দেশ এখনও বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকলেও কূটনৈতিক সূত্রগুলো আশা করছে, আলোচনা সফল হলে ভবিষ্যতে বিস্তৃত সংলাপের একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমানোর দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং নাগরিকদের প্রতি আচরণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আলোচনা কেবল তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মতপার্থক্য কতটা কাটবে, তা এখনও অনিশ্চিত। এরই মধ্যে দ্রুত কোনো সমঝোতা না হলে ইরানের ওপর সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাকে ‘আর্মাডা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, তাতে একটি বিমানবাহী রণতরী, একাধিক যুদ্ধজাহাজ এবং যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর জবাবে শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানও। তারা মধ্যপ্রাচ্য ও ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছে। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, যিনি সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে’ প্রস্তুত রয়েছে।
বিবিসি পার্সিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার শুরু হতে যাওয়া আলোচনায় যোগ দিতে আব্বাস আরাঘচি ইতোমধ্যে মাস্কাটে পৌঁছেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
গত জুনে ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলার পর এটিই হবে দুই দেশের কর্মকর্তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক।
ইরান দাবি করেছে, ওই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আলোচনা ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ এড়ানোর শেষ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে বর্তমান ইরানি সরকার এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাপক বিক্ষোভ এবং কঠোর দমন-পীড়নের কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।
ওয়াশিংটনভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অন্তত ৬ হাজার ৮৮৩ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সতর্ক করেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা বলে অভিযোগ করছে।
ইরান জানিয়েছে, নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে এবং প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আঞ্চলিক কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সমৃদ্ধকরণে তারা ছাড় দিতে পারেন।
মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত আলোচনা’ চালিয়ে যেতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বিরোধী শিবিরের দাবি, যেকোনো ছাড় বর্তমান ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ সুগম করবে।
আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ইরানে মার্কিন হামলা বৃহত্তর সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। তারা সতর্ক করে বলেছে, কেবল বিমান হামলা দিয়ে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উদ্বেগ থাকা উচিত কি না—এমন প্রশ্নে ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, “হ্যাঁ, তার খুব চিন্তিত হওয়া উচিত।”
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “আমি নিশ্চিত নই যে এই লোকদের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব কি না। তবে আমরা সেই পথ খুঁজে দেখব।”
উল্লেখ্য, প্রথমে মিশর, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইস্তাম্বুলে এই বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও ইরানের অনুরোধে শেষ মুহূর্তে স্থান পরিবর্তন করে মাস্কাটে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আলোচনা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধ জানায় তেহরান।
















