অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ত্রুটি না রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা—এস আলমের মামলায় বাংলাদেশ কেন কাঠগড়ায়?
- Update Time : ১০:৩৬:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১৭৭ Time View

যে দেশে বছরের পর বছর ধরে অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় করপোরেট দস্যুতার অভিযোগ পাহাড়সম হয়ে উঠেছে—সেই বাংলাদেশই আজ আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বাধ্য। বিস্ময় জাগে এই কারণে নয় যে মামলা হয়েছে; বিস্ময় জাগে এই কারণে যে, যিনি দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, সেই শিল্পগোষ্ঠীর কর্তা আজ নিজেকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছেন। কথায় আছে—চোরের মার বড় গলা। এস আলম গ্রুপের সালিসি মামলা যেন সেই প্রবাদকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের দায়ের করা মামলার মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত আইসিএসআইডিতে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫০ ডলার ফি দিয়ে ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা দেড় লাখ টাকারও বেশি। অর্থাৎ, যে অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা, সেই করের টাকাই আজ ব্যয় হচ্ছে রাষ্ট্রের আত্মপক্ষ সমর্থনে। প্রশ্ন হলো—যে পক্ষের বিরুদ্ধে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংসের অভিযোগ, জনগণের সঞ্চয় ঝুঁকিতে ফেলার দায়—তার বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রকে কেন এত ব্যয়বহুল আইনি প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হবে?
আইসিএসআইডিতে দায়ের করা মামলায় এস আলম পরিবার অভিযোগ করেছে—বাংলাদেশ সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্ত চালিয়েছে এবং গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই তথাকথিত ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ কি আসলে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও অনুসন্ধানের নথিভুক্ত ফল নয়? বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিভিন্ন টাস্কফোর্সের হিসাব অনুযায়ী, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে—এই তথ্য কি কল্পনা, নাকি রাষ্ট্রীয় সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে আসা বাস্তবতা?
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো নাগরিকত্বের কৌশল। নথি অনুযায়ী, এস আলম পরিবার ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। আজ সেই সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব দেখিয়েই তারা বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির আশ্রয় নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। প্রশ্ন জাগে—যখন সুবিধা, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারী; আর যখন জবাবদিহির সময়, তখন রাষ্ট্রীয় দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা? এটি কি আন্তর্জাতিক আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে দায়মুক্তির এক সুপরিকল্পিত কৌশল নয়?
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হওয়াই কি এই মামলার প্রকৃত ট্রিগার? অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে যেখানে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে—সেখানে তদন্তের সূচনা হতেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মামলা। এটি কি ন্যায়বিচারের সন্ধান, নাকি রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে পুরনো অবৈধ সুবিধা পুনরুদ্ধারের অপচেষ্টা?
আজ বাস্তবতা হলো—অভিযুক্ত শিল্পগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক আদালতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মামলা করছে, আর বাংলাদেশ রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দৃশ্য শুধু বৈষম্যের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ। যে দেশে অর্থ পাচারকারীরা এতটাই বেপরোয়া যে রাষ্ট্রকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে—সেই দেশে প্রশ্ন একটাই: আমরা কি সত্যিই চোর ধরছি, নাকি চোরের গলার আওয়াজেই রাষ্ট্র নতজানু হয়ে পড়ছে?
এস আলমের এই মামলা কেবল একটি আইনি লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার এক কঠিন পরীক্ষা। ফলাফল যা-ই হোক, ইতিহাস মনে রাখবে—এক সময় এমনও ছিল, যখন অভিযুক্তরাই সবচেয়ে জোরে কথা বলত, আর রাষ্ট্রকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হতো।















