রয়টার্সের বিশ্লেষণ: সংস্কারের মাধ্যমে রাজনৈতিক মূলধারায় জায়গা করে নিচ্ছে জামায়াত
- Update Time : ১০:৩০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৭৯ Time View

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকা বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে—এমনটাই উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর জামায়াত নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনে মনোযোগী হয়েছে। দলটি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বদলে ‘কল্যাণমূলক রাজনীতি’কে সামনে আনছে, যা জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)-এর ডিসেম্বর মাসের এক মতামত জরিপে জামায়াতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘পছন্দসই’ রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে বলা হয়, বিএনপির সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার সক্ষমতা অর্জন করেছে দলটি।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান রয়টার্সকে বলেন, “আমরা কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি নয়।” তিনি মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা, বন্যাদুর্গতদের ত্রাণ সহায়তা এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, গঠনমূলক ও মানবিক রাজনীতির কারণেই মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস জামায়াতের প্রতি বাড়ছে।
হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ও দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দলটির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন থেকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে গত বছর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে দলটি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সঙ্গে জোট গঠন করায় জামায়াতের ভাবমূর্তি আরও গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকার একটি বাজারে ভ্যান থেকে নারকেল বিক্রি করা ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জালাল রয়টার্সকে বলেন, “আমরা নতুন কিছু চাই। নতুন বিকল্প হিসেবে জামায়াতকে দেখছি। তাদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার এবং তারা দেশের জন্য কাজ করে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ধর্মতত্ত্ববিদ শফি মো. মোস্তফা বলেন, হাসিনার শাসনামলে নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনরোষ জামায়াতকে ‘পুনর্বাসিত প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করেছে। আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে সৃষ্ট হতাশার সুযোগে জামায়াত আবারও ‘ইসলামই সমাধান’—এই স্লোগান সামনে এনে নিজেকে নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।
প্রথমবারের মতো জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছে। দলটি তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, তারা ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চায়। নারীদের সমান অধিকারের কথাও প্রকাশ্যে বলা হলেও ৩০০টি আসনের জন্য এখনো কোনো নারী প্রার্থী ঘোষণা করেনি দলটি। তবে জামায়াতের আমিরের মতে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বরাদ্দ ৫০টি আসনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
জামায়াতের মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রয়টার্সকে বলেন, “আমাদের দল ধর্মের নামে কোনো সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতাকে কখনো সমর্থন করেনি, করেও না।”
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের জুনিয়র জোট অংশীদার থাকা জামায়াত বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। গত বছরের শুরু থেকেই তারা প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি ভোটারদের মনোভাব বুঝতে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নিয়োগ দিয়েছে।
সম্প্রতি জামায়াত ঘোষণা দিয়েছে, তারা ১৭৯টি আসনে নির্বাচন করবে। এর মধ্যে ৭৪টি আসন এনসিপি ও অন্যান্য শরিকদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। একটি শরিক দল জোট ছাড়ায় আরও ৪৭টি আসনের ভাগাভাগি এখনো বাকি রয়েছে।
জামায়াত প্রার্থী মীর আহমদ বিন কাসেম, যিনি হাসিনার শাসনামলে গুম হয়ে আয়নাঘরে আট বছর আটক ও নির্যাতনের শিকার হন, রয়টার্সকে বলেন—দেশজুড়ে মানুষ পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিরক্ত এবং পরিবর্তন চায় বলেই তিনি জামায়াতে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই। কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়া নয়—সবাইকে সম্মান করাই আমাদের নীতি।” (সংক্ষেপিত)
















