সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওয়াশিংটন পোস্টের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন: জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, বাড়তে পারে ভারত–মার্কিন টানাপড়েন

অনলাইন ডেস্ক
  • Update Time : ০৯:৪৭:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৫৮ Time View

বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঞ্চল্যকর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকরা। এমনকি দলটিকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ ডিসেম্বর নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকটাই ‘ইসলামপন্থী ধারায়’ ঝুঁকছে। তিনি পূর্বাভাস দেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক ও আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় মনোভাব দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে। কারণ ভারত ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও মার্কিন কূটনীতিকরা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন। অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, ওই কূটনীতিক বলেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে কট্টর শরিয়াহ আইন বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো নীতি গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকেই তারা প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরছে।

অডিও রেকর্ডিংয়ে ওই মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।” তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের টকশোতে আমন্ত্রণ জানানো যায় কি না।

তবে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই এক বিবৃতিতে জানান, ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি রুটিনমাফিক অফ-দ্য-রেকর্ড বৈঠক। সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নেয় না। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকের মন্তব্য নিয়ে দলটি কোনো মন্তব্য করতে চায় না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসানের মতে, জামায়াত এখন বাংলাদেশের ‘মূলধারার’ রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।

নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন জামায়াত ভালো ফল করতে পারে, তবে তিনি তাদের জোটে নিতে আগ্রহী নন। যদিও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে যৌথভাবে সরকার গঠনে তারা আগ্রহী।

অর্থনৈতিক দিক নিয়েও সতর্কবার্তা দেন ওই মার্কিন কূটনীতিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। নারীদের কর্মসংস্থান সীমিত করা হলে আন্তর্জাতিক অর্ডার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জামায়াতে অনেক শিক্ষিত ও বাস্তববাদী মানুষ থাকায় তারা এমন সিদ্ধান্ত নেবে না।

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

ওয়াশিংটন পোস্টের চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন: জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, বাড়তে পারে ভারত–মার্কিন টানাপড়েন

Update Time : ০৯:৪৭:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঞ্চল্যকর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে আগ্রহী ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিকরা। এমনকি দলটিকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১ ডিসেম্বর নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত এক মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকটাই ‘ইসলামপন্থী ধারায়’ ঝুঁকছে। তিনি পূর্বাভাস দেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো ফল করবে।

দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক ও আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, জামায়াতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় মনোভাব দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দূরত্ব বাড়াতে পারে। কারণ ভারত ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে।

তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও মার্কিন কূটনীতিকরা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন। অডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, ওই কূটনীতিক বলেন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় এসে কট্টর শরিয়াহ আইন বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো নীতি গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে দলটি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন ও নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর পক্ষে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকেই তারা প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরছে।

অডিও রেকর্ডিংয়ে ওই মার্কিন কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, “আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।” তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের টকশোতে আমন্ত্রণ জানানো যায় কি না।

তবে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই এক বিবৃতিতে জানান, ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি রুটিনমাফিক অফ-দ্য-রেকর্ড বৈঠক। সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নেয় না। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জামায়াতে ইসলামীর মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান বলেন, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকের মন্তব্য নিয়ে দলটি কোনো মন্তব্য করতে চায় না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশার হাসানের মতে, জামায়াত এখন বাংলাদেশের ‘মূলধারার’ রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।

নির্বাচনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন জামায়াত ভালো ফল করতে পারে, তবে তিনি তাদের জোটে নিতে আগ্রহী নন। যদিও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে যৌথভাবে সরকার গঠনে তারা আগ্রহী।

অর্থনৈতিক দিক নিয়েও সতর্কবার্তা দেন ওই মার্কিন কূটনীতিক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়। নারীদের কর্মসংস্থান সীমিত করা হলে আন্তর্জাতিক অর্ডার বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। তবে একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জামায়াতে অনেক শিক্ষিত ও বাস্তববাদী মানুষ থাকায় তারা এমন সিদ্ধান্ত নেবে না।