ব্যাংক লুটের দায় কার? আর্থিক সংস্কার না কি আমানতকারীর সঙ্গে প্রতারণা
- Update Time : ১১:৪৪:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২০৯ Time View

আধুনিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংক খাতকে যেকোনো দেশের অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশে পতিত শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা কিছু অলিগার্ক গোষ্ঠীকে ব্যাংকে গচ্ছিত সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ লুটে নেওয়ার অবাধ সুযোগ দেওয়া হয়। সেই সময়ের অপশাসন, অনিয়ম ও লুটপাটের জের আজও তীব্রভাবে বিদ্যমান, যার দায় এখন চাপানো হচ্ছে নিরীহ আমানতকারীদের ওপর।
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথাকথিত ‘রেজুলিউশন স্কিম’ নামের সিদ্ধান্ত কার্যত সেই লুটপাটের দায় সাধারণ মানুষের কাঁধে তুলে দিয়েছে। ঋণের নামে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, তাদের পরিবর্তে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে ব্যাংকে টাকা রাখা সাধারণ নাগরিকদের। বিশেষ করে পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকে গচ্ছিত আমানতের ওপর দুই বছরের মুনাফা বাতিল এবং সরাসরি হেয়ারকাট আরোপের সিদ্ধান্ত শুধু আর্থিকভাবে নয়, নীতিগত ও নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত বিতর্কিত। এটি চুরির দায় ভুক্তভোগীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার শামিল। বলা যায়, বিনা দোষে শাস্তি দেওয়ার একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নোটিশের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানায়, রেজুলিউশন স্কিমের ‘অভিন্ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে দ্রুত আমানত হিসাব পুনর্গণনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমানতের ওপর কোনো মুনাফা গণনা করা হবে না। এমনকি বিদ্যমান স্থিতির ভিত্তিতে হিসাব পুনর্গণনার মাধ্যমে আমানতকারীদের চূড়ান্ত স্থিতি আরও কমিয়ে দেওয়া হবে। অথচ যারা কখনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না, ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন না কিংবা কোনো অনিয়মে যুক্ত ছিলেন না—আজ তারাই সরাসরি আর্থিক শাস্তির মুখে পড়ছেন।
এ বাস্তবতার পেছনে রয়েছে পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ গুটিকয় ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর ভয়াবহ ব্যাংক লুট। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণের নামে বের করে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু এস আলম গ্রুপই ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি কার্যত অনুপস্থিত ছিল। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ব্যাংকগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করা হয়। আজ সেই দুর্বলতার দায় চাপানো হচ্ছে আমানতকারীদের ওপর, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
প্রশ্ন হলো, কেন এই অনিয়মের খেসারত সাধারণ আমানতকারীরা বহন করবেন? ব্যাংকে আমানত রাখা মানে নির্দিষ্ট সময় শেষে নির্দিষ্ট হারে সুদ বা মুনাফা পাওয়ার আইনি ও নৈতিক নিশ্চয়তা। কিন্তু এখন সেই নিশ্চয়তাই বাতিল করা হচ্ছে। অন্যদিকে হেয়ারকাট মানে আমানতের একটি অংশ স্থায়ীভাবে কেটে নেওয়া—যা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাধারণত বড় বিনিয়োগকারী, ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারহোল্ডার বা উচ্চ ঝুঁকির অংশীদারদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ বাংলাদেশে এই কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীর ওপর, যাদের অনেকের এই টাকাই জীবনের শেষ সম্বল। এর প্রভাব সরাসরি তাদের জীবনযাত্রা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর পড়বে।
যারা হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে আমানতকারীদের টাকায় ব্যাংকের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িতদের জব্দকৃত সম্পদ বিক্রি করে সহজেই এই দায় শোধ করা যেত। প্রয়োজনে রাষ্ট্র নিজেই সম্পদ কিনে বা বিশেষ তহবিল গঠন করে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারত। তাহলে সাধারণ মানুষকে এই অন্যায় ক্ষতির শিকার হতে হতো না।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পুরো প্রক্রিয়া গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এ সিদ্ধান্ত এক ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে—যে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ করলেও শেষ পর্যন্ত তার বোঝা বইতে হবে সাধারণ আমানতকারীদের। এটি ব্যাংক খাতে নৈতিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে আরও অনিয়মকে উৎসাহিত করবে। একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আমানতকারীর আস্থা অটুট থাকে। সেই আস্থাকে ভেঙে দিয়ে কোনো সংস্কার টেকসই হতে পারে না—বরং তা নতুন সংকটের জন্ম দেয়।














