যে কারণে ভেনেজুয়েলার তেলের টাকা কাতারের ব্যাংকে রাখছেন ট্রাম্প
- Update Time : ০৫:১৬:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১৩৯ Time View

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করে অর্জিত অর্থ সরাসরি দেশটিতে না পাঠিয়ে কাতারের ব্যাংকে জমা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা পাওনাদার ও আইনি জটিলতা থেকে ভেনেজুয়েলার তেলের অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং একই সঙ্গে দেশটির ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।
কেন কাতারের ব্যাংক?
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা কার্যত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ যাতে পশ্চিমা কোনো পাওনাদার বা আদালতের জটিলতায় আটকে না যায়, সেজন্যই কাতারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। কাতার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখায় এই ভূমিকা পালনে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য।
ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকেই এই অর্থ ধাপে ধাপে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। দেশটির স্থানীয় ব্যাংকগুলোও নগদ অর্থের জোগান বেড়েছে বলে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ও আইনি সুরক্ষা
ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের অর্থ রক্ষায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। এই আদেশের ফলে কোনো পক্ষ এই অর্থের ওপর আইনি দাবি বা লিয়েন আরোপ করতে পারবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্দেশ্য হলো—ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের অর্থ যেন সরাসরি মানবিক প্রয়োজনে ব্যয় হয় এবং কোনো পাওনাদার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে না পড়ে।
কাতারকে বেছে নেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক বাস্তবতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকা রেখে আসছে। এমনকি বাইডেন প্রশাসনের সময় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল হলে একই ধরনের আর্থিক লেনদেন কাতারের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছিল।
স্বচ্ছতা নিয়ে
এই ব্যবস্থাকে ঘিরে ওয়াশিংটনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন একে ‘আইনবহির্ভূত’ ও ‘দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। সমালোচকদের প্রধান উদ্বেগগুলো হলো—
স্বচ্ছতার অভাব: কাতারের ব্যাংকে অর্থ রাখা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আইনি নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা এই তহবিলকে একটি গোপন তহবিলে পরিণত করতে পারে।
অর্থ অপব্যবহারের আশঙ্কা: সমালোচকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই অর্থ ব্যবহার করে দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক গোষ্ঠী বা মাদকচক্রকে সুবিধা দিতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র কেন ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল?
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কেন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি আগ্রহী—এর পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও অর্থনৈতিক কারণ।
১. ভারী তেলের প্রয়োজন: যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তেলের বড় অংশই হালকা অপরিশোধিত তেল। অথচ টেক্সাস ও লুইজিয়ানার বহু তেল পরিশোধনাগার ভারী ও ঘন তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য নকশা করা।
২. বিপুল ব্যয়: এসব পরিশোধনাগারকে হালকা তেলের উপযোগী করতে হলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার, যা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবসম্মত নয়।
৩. ভৌগোলিক সুবিধা: কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলাতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভারী তেলের মজুত রয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ কাতারের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার এই উদ্যোগ কেবল শুরু মাত্র। ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ একই পথে লেনদেন হতে পারে, যা লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
















