সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরানের আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৪৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৩৪ Time View

 

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় নিজেদের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর চলমান সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পতন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতেই এই আগাম ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোসহ একাধিক সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্য ও বেসামরিক কর্মীদের আংশিকভাবে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে যদি ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তাহলে ওই দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইরানের এই হুমকির পরপরই সৌদি আরব তেহরানকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, তাদের আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিক ও কূটনৈতিক কর্মীদের চলাচলের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে ওয়াশিংটন।

এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইরানের প্রধান বিচারপতি সাফ ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন, রাজপথে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরান আপাতত বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। যদিও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দাবি, প্রতিদিনই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।

ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থার কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যে সামান্য যোগাযোগ অবশিষ্ট ছিল, তাও এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক হুমকির মধ্যে কোনো ধরনের সংলাপ বা আলোচনার পরিবেশ আর বিদ্যমান নেই।

এই সংকটের প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জার্মানির বার্লিনে হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পদযাত্রা করেছেন। অন্যদিকে তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে সরকার সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশ করে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সূত্র: রয়টার্স

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরানের আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ

Update Time : ১১:৪৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

 

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কায় নিজেদের আকাশসীমা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। দেশটির ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর চলমান সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পতন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনা এখন সরাসরি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতেই এই আগাম ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের উড়োজাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোসহ একাধিক সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে উপস্থাপন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি থেকে সেনা সদস্য ও বেসামরিক কর্মীদের আংশিকভাবে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি কড়া ভাষায় সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করে যদি ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তাহলে ওই দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইরানের এই হুমকির পরপরই সৌদি আরব তেহরানকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, তাদের আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিক ও কূটনৈতিক কর্মীদের চলাচলের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে ওয়াশিংটন।

এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইরানের প্রধান বিচারপতি সাফ ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন, রাজপথে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরান আপাতত বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। যদিও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দাবি, প্রতিদিনই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।

ক্রমবর্ধমান যুদ্ধাবস্থার কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে যে সামান্য যোগাযোগ অবশিষ্ট ছিল, তাও এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে পূর্বনির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের অব্যাহত সামরিক হুমকির মধ্যে কোনো ধরনের সংলাপ বা আলোচনার পরিবেশ আর বিদ্যমান নেই।

এই সংকটের প্রভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জার্মানির বার্লিনে হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পদযাত্রা করেছেন। অন্যদিকে তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের সামনে সরকার সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশ করে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহৎ আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সূত্র: রয়টার্স