সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কা, সতর্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১০:৩৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ১৪৭ Time View

 

ইরানে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক ও কঠোর অভিযানে নিহতের সংখ্যা আগের সকল আনুমানিক হিসাব ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন অভ্যন্তরীন সূত্র ও ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১২ হাজার থেকে সম্ভাব্য ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, যা পূর্ববর্তী ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

 

গত পাঁচ দিন ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর মঙ্গলবার কিছু ফোন লাইন পুনরায় চালু হলে বিভিন্ন অভ্যন্তরীন সূত্র এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। যদিও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে তাদের ধারণা হিসেবে অন্তত ২ হাজার নিহতের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি স্বীকার করেছেন যে প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপস্থাপন করে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের একটি শকিং ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, যা সিবিএস নিউজ যাচাই করে নিশ্চিত করেছে। ১৬ মিনিটের সেই ভিডিওটিতে অন্তত ৩৬৬ থেকে ৪০০টি লাশ স্তূপ করে রাখা দেখা গেছে, যেখানে ফরেনসিক কর্মীরা গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাত ও মারাত্মক জখম নথিভুক্ত করছেন। মর্গের ভেতরে রক্তাক্ত কাপড় ও শোকাহত মানুষের ভিড় প্রকৃত মৃত্যুর ব্যাপকতারই ইঙ্গিত দেয়।

ইরান সরকার বিক্ষোভে নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক বা নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও রয়টার্স একজন অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা এই সহিংসতার দায় বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী’ ও ভাড়াটে উসকানিকারীদের উপর চাপিয়েছেন।

 

এদিকে, নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম একটি ভয়াবহ চিত্র এঁকেছেন। তিনি জানান, তারা যে তথ্য পাচ্ছেন তা “কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে” এবং অভিযোগ করেছেন যে নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের তথ্য জবরদস্তি করে হাতিয়ে নিচ্ছে। তার মতে, গোটা ইরানকে একটি বিশাল “একাকী কারাকক্ষে” পরিণত করে নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, “সাহায্য আসছে”। তিনি ইরানের “দেশপ্রেমিকদের” আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করার আহ্বান জানান। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই সংকট মোকাবিলায় প্রথাগত বিমান হামলা ছাড়াও বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা বিকল্প বিবেচনা করছে।

নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোর দাবি জানান যে, ইরানি জনগণ এখন কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার দাবি, দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বর্তমান শাসনের অবসান চান, এবং যত দ্রুত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হবে, প্রাণহানি ততই কমবে ও শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।

 

এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘রেসপন্সিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ বা বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার দায়বদ্ধতা নীতির প্রয়োগ নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।

 

সূত্র: সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে।

Please Share This Post in Your Social Media

One thought on “নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কা, সতর্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়ানোর আশঙ্কা, সতর্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

Update Time : ১০:৩৯:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬

 

ইরানে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক ও কঠোর অভিযানে নিহতের সংখ্যা আগের সকল আনুমানিক হিসাব ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন অভ্যন্তরীন সূত্র ও ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১২ হাজার থেকে সম্ভাব্য ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন, যা পূর্ববর্তী ধারণার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

 

গত পাঁচ দিন ধরে দেশটিতে ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর মঙ্গলবার কিছু ফোন লাইন পুনরায় চালু হলে বিভিন্ন অভ্যন্তরীন সূত্র এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। যদিও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার পার্লামেন্টে তাদের ধারণা হিসেবে অন্তত ২ হাজার নিহতের কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি স্বীকার করেছেন যে প্রকৃত সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপস্থাপন করে তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মর্গের একটি শকিং ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, যা সিবিএস নিউজ যাচাই করে নিশ্চিত করেছে। ১৬ মিনিটের সেই ভিডিওটিতে অন্তত ৩৬৬ থেকে ৪০০টি লাশ স্তূপ করে রাখা দেখা গেছে, যেখানে ফরেনসিক কর্মীরা গুলির ক্ষত, শটগানের আঘাত ও মারাত্মক জখম নথিভুক্ত করছেন। মর্গের ভেতরে রক্তাক্ত কাপড় ও শোকাহত মানুষের ভিড় প্রকৃত মৃত্যুর ব্যাপকতারই ইঙ্গিত দেয়।

ইরান সরকার বিক্ষোভে নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক বা নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও রয়টার্স একজন অজ্ঞাতনামা ইরানি কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার হতে পারে। ওই কর্মকর্তা এই সহিংসতার দায় বিদেশি মদতপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী’ ও ভাড়াটে উসকানিকারীদের উপর চাপিয়েছেন।

 

এদিকে, নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’-এর প্রধান মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম একটি ভয়াবহ চিত্র এঁকেছেন। তিনি জানান, তারা যে তথ্য পাচ্ছেন তা “কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে” এবং অভিযোগ করেছেন যে নিরাপত্তা বাহিনী তেহরানের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়ে আহতদের তথ্য জবরদস্তি করে হাতিয়ে নিচ্ছে। তার মতে, গোটা ইরানকে একটি বিশাল “একাকী কারাকক্ষে” পরিণত করে নির্যাতন ও হত্যা করা হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, “সাহায্য আসছে”। তিনি ইরানের “দেশপ্রেমিকদের” আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করার আহ্বান জানান। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই সংকট মোকাবিলায় প্রথাগত বিমান হামলা ছাড়াও বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা বিকল্প বিবেচনা করছে।

নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোর দাবি জানান যে, ইরানি জনগণ এখন কেবল মৌখিক সমর্থন নয়, বরং কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। তার দাবি, দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বর্তমান শাসনের অবসান চান, এবং যত দ্রুত আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হবে, প্রাণহানি ততই কমবে ও শাসনের পতন ত্বরান্বিত হবে।

 

এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘রেসপন্সিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ বা বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষার দায়বদ্ধতা নীতির প্রয়োগ নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে।

 

সূত্র: সিবিএস নিউজের প্রতিবেদন অবলম্বনে।