সময়: শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করার হুমকিতে ভারত নীরব থাকবে না: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

ডিজিটাল ডেস্ক
  • Update Time : ১১:৪৭:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / ১৫৪ Time View

ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে (নর্থ-ইস্ট) বিচ্ছিন্ন করার হুমকি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নয়াদিল্লি আর চুপ করে বসে থাকবে না—এমন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে যে কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বা হুমকির জবাব দিতে ভারত প্রস্তুত।

মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ভারত থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া বা ওই অঞ্চলকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে একীভূত করার আহ্বান বারবার শোনা যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে অবাস্তব ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের কিছু মহলের হীন মানসিকতার প্রতিফলন। গত এক বছর ধরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল কল্পনাপ্রসূতই নয়, বাংলাদেশের জন্যও মারাত্মক ভুল চিন্তার পরিচয় বহন করে।”

আসামের মুখ্যমন্ত্রী ভারতকে একটি বিশাল রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভারত শুধু ভৌগোলিকভাবে বড় নয়, বরং একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে হুমকি দেওয়া চরম দায়িত্বহীনতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হেমন্ত বিশ্ব শর্মা আরও বলেন, “আমাদের উচিত এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। প্রয়োজনে বাংলাদেশকে সাহায্য দেওয়ার বিষয়েও পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে—ভারতের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য বা হুমকি দিলে আমরা নীরব থাকব না।”

বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটেই আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। গত সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশে হাসনাত আব্দুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে আলাদা করে দেওয়া হবে। এই বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের স্থলবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব তুলে ধরে মন্তব্য করেছিলেন যে, সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশই ওই অঞ্চলের একমাত্র কার্যকর অভিভাবক। এই বক্তব্যের পর থেকেই ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সংযুক্ত রাখা একটি অত্যন্ত সরু ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পথ। এ প্রসঙ্গে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, যারা এই করিডর নিয়ে ভারতকে হুমকি দিচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত—বাংলাদেশেরও নিজস্ব দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ করিডর রয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম ঝুঁকিপূর্ণ করিডরটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম গারো হিলস পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দ্বিতীয়টি হলো দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে বঙ্গোপাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মাত্র ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম করিডর, যা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উসকানিমূলক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক, এবং এ ক্ষেত্রে সংযম ও কূটনৈতিক সংলাপই হতে পারে একমাত্র কার্যকর পথ।

সূত্র: দ্য হিন্দু

 

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করার হুমকিতে ভারত নীরব থাকবে না: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

Update Time : ১১:৪৭:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে (নর্থ-ইস্ট) বিচ্ছিন্ন করার হুমকি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে নয়াদিল্লি আর চুপ করে বসে থাকবে না—এমন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা নিয়ে যে কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বা হুমকির জবাব দিতে ভারত প্রস্তুত।

মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ভারত থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করে নেওয়া বা ওই অঞ্চলকে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে একীভূত করার আহ্বান বারবার শোনা যাচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে অবাস্তব ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের কিছু মহলের হীন মানসিকতার প্রতিফলন। গত এক বছর ধরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল কল্পনাপ্রসূতই নয়, বাংলাদেশের জন্যও মারাত্মক ভুল চিন্তার পরিচয় বহন করে।”

আসামের মুখ্যমন্ত্রী ভারতকে একটি বিশাল রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভারত শুধু ভৌগোলিকভাবে বড় নয়, বরং একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে হুমকি দেওয়া চরম দায়িত্বহীনতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হেমন্ত বিশ্ব শর্মা আরও বলেন, “আমাদের উচিত এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। প্রয়োজনে বাংলাদেশকে সাহায্য দেওয়ার বিষয়েও পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে—ভারতের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য বা হুমকি দিলে আমরা নীরব থাকব না।”

বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটেই আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। গত সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সমাবেশে হাসনাত আব্দুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হলে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে আলাদা করে দেওয়া হবে। এই বক্তব্য দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের স্থলবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব তুলে ধরে মন্তব্য করেছিলেন যে, সমুদ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশই ওই অঞ্চলের একমাত্র কার্যকর অভিভাবক। এই বক্তব্যের পর থেকেই ভারতের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সংযুক্ত রাখা একটি অত্যন্ত সরু ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পথ। এ প্রসঙ্গে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, যারা এই করিডর নিয়ে ভারতকে হুমকি দিচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত—বাংলাদেশেরও নিজস্ব দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ করিডর রয়েছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রথম ঝুঁকিপূর্ণ করিডরটি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম গারো হিলস পর্যন্ত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ। দ্বিতীয়টি হলো দক্ষিণ ত্রিপুরা থেকে বঙ্গোপাগর পর্যন্ত বিস্তৃত মাত্র ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম করিডর, যা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনাকর কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উসকানিমূলক বক্তব্যের পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক, এবং এ ক্ষেত্রে সংযম ও কূটনৈতিক সংলাপই হতে পারে একমাত্র কার্যকর পথ।

সূত্র: দ্য হিন্দু