নারী চিকিৎসকের হিজাব টান দিয়ে খুলে ফেললেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী
- Update Time : ১১:৫৪:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১৫৫ Time View

ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমারের বিরুদ্ধে সরকারি এক অনুষ্ঠানে এক মুসলিম নারী চিকিৎসকের হিজাব টেনে খুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) পাটনায় আয়োজিত একটি সরকারি অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ৭৪ বছর বয়সী জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর প্রধান ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার একটি সরকারি নিয়োগ অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আয়ুষ (আয়ুর্বেদ, যোগ ও ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধা ও হোমিওপ্যাথি) বিভাগের একজন নারী চিকিৎসকের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়ই ঘটে বিতর্কিত ঘটনাটি।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিতিশ কুমার প্রথমে ওই নারী চিকিৎসককে ইশারায় তার হিজাব সরাতে বলেন। নারী চিকিৎসক বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই মুখ্যমন্ত্রী নিজেই হাত বাড়িয়ে তার হিজাব টেনে নামিয়ে দেন। এতে প্রকাশ্যে ওই নারীর মুখ ও থুতনি দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। এই আচরণে অনুষ্ঠানস্থলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মঞ্চের পেছনে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হাসাহাসি করছেন। একই সঙ্গে বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রীকে থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়, যদিও ততক্ষণে পরিস্থিতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
একজন মুসলিম নারী চিকিৎসকের সঙ্গে এমন আচরণ করায় নিতিশ কুমারের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দাবি, একজন মুখ্যমন্ত্রী ও সংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণ শুধু অশোভনই নয়, বরং তা নারীর মর্যাদা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই ঘটনাকে ‘জঘন্য’ ও ‘লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে। কংগ্রেসের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, “একজন নারী চিকিৎসক সম্মানের সঙ্গে নিয়োগপত্র নিতে এসেছিলেন। অথচ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে তার হিজাব টেনে নামালেন। বিহারের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন ঘৃণ্য আচরণ অগ্রহণযোগ্য। এমন রাজ্যে নারীরা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। এই ঘটনার দায় নিয়ে নিতিশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।”
বিরোধী দল আরজেডিও (রাষ্ট্রীয় জনতা দল) নিতিশ কুমারের কড়া সমালোচনা করেছে। বিজেপির সঙ্গে জোট গড়ে মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিতিশের বিরুদ্ধে আরজেডি এক বিবৃতিতে বলেছে, পর্দাশীল মুসলিম নারীর হিজাব প্রকাশ্যে টেনে খোলার ঘটনা জেডিইউ ও বিজেপির তথাকথিত ‘নারী ক্ষমতায়ন’ রাজনীতির প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করেছে।
আরজেডির এক্স হ্যান্ডেলে হিন্দিতে লেখা হয়, “নীতীশজিকে কী হয়েছে? তার মানসিক অবস্থা এখন সম্পূর্ণ করুণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।” দলটি দাবি করেছে, এ ধরনের আচরণ সংখ্যালঘু নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি করছে।
এটি নিতিশ কুমারের প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার বিতর্কিত আচরণের কারণে সমালোচিত হয়েছেন। গত নভেম্বরে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে এক জনসভায় এক নারীর গলায় মালা পরানোর একটি ভিডিও ভাইরাল হলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। সে সময় এক জেডিইউ সংসদ সদস্য তাকে থামানোর চেষ্টা করলে মুখ্যমন্ত্রী উল্টো তাকে ধমক দেন, যা নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতে নারীর সম্মান, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একজন মুখ্যমন্ত্রীর এমন আচরণ শুধু ব্যক্তিগত শিষ্টাচারের প্রশ্ন নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংবিধানস্বীকৃত অধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রতিফলন।
















