যুক্তরাষ্ট্রের আল্টিমেটাম: ২০২৭ সালের মধ্যে ন্যাটোর মূল প্রতিরক্ষা দায়িত্ব ইউরোপকে নিজেদের কাঁধে তুলতে হবে
- Update Time : ১০:৩৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১০৯ Time View

ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরও স্বনির্ভর হতে কঠোর বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, ২০২৭ সালের মধ্যেই ন্যাটোর প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি বড় অংশ—গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে নজরদারি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা সমন্বয়—ইউরোপকে নিজ দায়িত্বে নিতে হবে।
রয়টার্সের রিপোর্ট অনুসারে, ইতোমধ্যেই পেন্টাগন এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বার্তা দিয়েছে। পাঁচটি নির্ভরযোগ্য সূত্র—যার মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন—বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাদের মতে, আলোচনা ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গোপন।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া: সময়সীমা ‘অবাস্তব’ এবং অত্যন্ত চাপের
বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা মনে করছেন, মাত্র তিন বছরের মধ্যে এত বড় ধরনের প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন করা ‘অবাস্তব’ এবং কার্যত অসম্ভব। কারণ—
- যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোতে যে সামরিক সক্ষমতা সরবরাহ করে, তার বেশ কিছু টাকা দিয়ে কেনা যায় না, বরং সেগুলো বহু দশকের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং সামরিক পরিকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
- বিশেষ করে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং, স্যাটেলাইট নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ, ইলেকট্রনিক ও সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা—যেগুলো ইউক্রেন যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—সেগুলোর বিকল্প তৈরি করা ইউরোপের পক্ষে এখনই সম্ভব নয়।
- এমনকি প্রয়োজনীয় অর্থ থাকলেও রাজনৈতিক ঐক্য, সামরিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সমন্বয় তৈরিতে বহু বছর সময় লাগবে।
এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা যতই ইচ্ছুক হই, ২০২৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়। এটি বহু স্তরের সামরিক সক্ষমতার বিষয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতা: সময়সীমা না মানলে ন্যাটোর কিছু দায়িত্ব থেকে সরে আসবে ওয়াশিংটন
সূত্রগুলো জানিয়েছে, পেন্টাগন স্পষ্ট করে জানিয়েছে—
যদি ইউরোপ ২০২৭ সালের সময়সীমা পূরণ করতে না পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর কিছু প্রতিরক্ষা সমন্বয় ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারে।
এটি ন্যাটোর জন্য বড় ধাক্কা হবে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র একাই এই জোটের সামরিক শক্তির প্রায়
রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরেই মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনকে নিয়ে বৈশ্বিক টানাপোড়েনে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগ ‘ইন্দো–প্যাসিফিক’ অঞ্চলে সরাতে হবে—সেই কারণেই ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা কমানো জরুরি।
ইউক্রেন যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের হতাশার মূল কারণ
পেন্টাগনের মতে, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপ প্রতিরক্ষা ব্যয় কিছুটা বাড়ালেও তা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়।
- ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশের মধ্যে কেবল মাত্র এক-তৃতীয়াংশ দেশই ন্যূনতম জিডিপির ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে।
- অধিকাংশ দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল—বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক পরিবহন এবং সমন্বিত ন্যাটো কমান্ড ব্যবস্থায়।
ওয়াশিংটন মনে করছে, ইউরোপ যদি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্যের ওপর চিরস্থায়ী নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ।
ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া: ইউরোপ দায়িত্ব নিচ্ছে, তবে সময়সীমা নিয়ে নীরবতা
নাটোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন—
“ইউরোপীয় মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে বেশি দায়িত্ব নিতে শুরু করেছে। প্রতিরক্ষায় বিনিয়োগও বাড়ছে।”
তবে তিনি ২০২৭ সালের সময়সীমা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি—যা থেকে বোঝা যায় সময়সীমা নিয়ে ন্যাটোর মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে।
বিশ্লেষণ: ইউরোপ কি প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটোর জন্য প্রস্তুত নয়:
- আমেরিকান গোয়েন্দা ও নজরদারি ছাড়া ন্যাটো কার্যত অন্ধ।
- সামরিক পরিবহন ও লজিস্টিক—যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা পাঠানো থেকে শুরু করে অস্ত্র পরিবহন—প্রায় পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর।
- ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পও এখনো মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
- রাজনৈতিক ঐক্যও দুর্বল—ফ্রান্স-জার্মানি-ইতালি-বাল্টিক দেশগুলোর নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিষয়ে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তা স্পষ্ট করে দেয়—
হোক সে বাজেট, প্রযুক্তি বা রাজনৈতিক সক্ষমতা—ইউরোপকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২০২৭ সালের সময়সীমা বাস্তবসম্মত হোক বা না হোক, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো যে আমূল পরিবর্তনের মুখে—তা এখন নিশ্চিত।
















