বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তি বন্ধ করেছে যুক্তরাজ্যের অন্তত ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়
- Update Time : ১০:৩২:২০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
- / ১২১ Time View

যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভিসা–সম্পর্কিত ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এর ফলস্বরূপ, দেশটির বেশ কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন বাতিল, সীমিত বা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে শুরু করেছে। বিষয়টি যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ৯টি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে ‘উচ্চ ঝুঁকির দেশ’ তালিকায় রেখে ভর্তির ওপর নতুন বিধিনিষেধ জারি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশ্রয় প্রার্থনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ ভিসা প্রক্রিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তির কার্যক্রম আরও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি স্থগিত বা বন্ধ করেছে
১. ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার
২০২৫ সালের অটাম সেশন পর্যন্ত পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের সব ধরনের আবেদন স্থগিত করেছে।
২. ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ।
৩. ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন
পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
৪. লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের সিএএস লেটার দেওয়া বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়টি জানিয়েছে—ভিসা নাকচ হওয়া আবেদনকারীর ৬০ শতাংশই বাংলাদেশি।
৫. সান্ডারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়
দুই দেশ থেকেই আবেদন গ্রহণ স্থগিত।
৬. অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি
CAS লেটার জারি সীমিত এবং কিছু ক্ষেত্রে আবেদন বাতিল।
৭. বিপিপি ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই এবং বহু আবেদন প্রত্যাখ্যান।
৮. কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে ভর্তির আবেদন স্থগিত।
৯. হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি আবেদন গ্রহণ বন্ধ রেখেছে।
এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নীরবে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে, ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
কেন এত কঠোর হলো যুক্তরাজ্যের ভিসা নীতি?
২০২4 সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস নতুন ‘ভিসা কমপ্লায়েন্স নীতি’ চালু করে। নতুন নীতিতে বলা হয়:
- কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভিসা আবেদনের ৫% এর বেশি নাকচ হলে তাদের স্পনসর লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়বে।
পূর্বে এই সীমা ছিল ১০%। - শিক্ষার্থীর ক্লাসে উপস্থিতির হার,
- মাঝপথে কোর্স ত্যাগের হার,
- ছাত্র ভিসার অপব্যবহারের হার—
সব কিছুই এখন কঠোর মূল্যায়নের আওতায়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়:
- ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের হার—২২%,
পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের—১৮%।
যা নতুন সীমার দ্বিগুণেরও বেশি। - হোম অফিস যেসব ২৩,০৩৬টি ভিসা নাকচ করেছে, তার প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের।
- দুই দেশের নাগরিকদের আশ্রয় প্রার্থনার হারও দ্রুত বেড়েছে—যাদের অনেকেই কাজ বা স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে গিয়ে পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা
লাহোরভিত্তিক ‘অ্যাডভান্স অ্যাডভাইজর্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা মরিয়ম আব্বাস বলেন—
“যাচাই–বাছাইয়ের কঠোরতা বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রকৃত শিক্ষার্থীর আবেদন শেষ মুহূর্তে আটকে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।”
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল অ্যাডমিশনস-এর জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন—
“যদিও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন বন্ধ করেছে, তবুও যুক্তরাজ্যের শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য খোলা। তবে কিছু শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসাকে আশ্রয় প্রার্থনার পথ হিসেবে ব্যবহার করায় দেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন—
“শিক্ষার্থীদের উচিত যুক্তরাজ্যের স্টুডেন্ট ভিসাকে ‘ট্রানজিট রুট’ হিসেবে ব্যবহার না করে প্রকৃত উদ্দেশ্য—পড়াশোনা—সঠিকভাবে সম্পন্ন করা।”
আগামী বছরে নীতি আরও কঠোর হতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাজ্যের এই নতুন নীতিমালা আগামী বছর আরও কঠোর হবে। এতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ আরও বাড়বে। ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া কঠিন হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের ভর্তি নীতিতে কঠোরতা অব্যাহত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর ফলে দুই দেশের প্রকৃত শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেকেই হয়তো কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের অন্যান্য দেশে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবে।
















